মঙ্গলবার   ১০ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২৫ ১৪২৬   ১২ রবিউস সানি ১৪৪১

খাবারের আগে ও পরে যে দোয়া পড়তে হয়

প্রকাশিত: ৩০ নভেম্বর ২০১৯  

প্রত্যেক কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা সুন্নত। খাবারের শুরুতেও বিসমিল্লাহ বলা সুন্নত। প্রত্যেক কাজের শুরুতে আল্লাহ তায়ালার নাম নেয়ার মানে বান্দার পক্ষ হতে একথা স্বীকার করে নেয়া যে, আয় আল্লাহ, আমি যা কিছুই খেতে শুরু করেছি, এসব আপনারই দান। আপনার দয়া ও এহসান, তাই আপনার নামেই খানা খাওয়া শুরু করেছি।

খানা খাওয়া শুরু করার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়া পড়তেন, 

بسم الله وعلى بركةالله بعالى

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়া আলা বারকাতিল্লাহ

অর্থ: আল্লাহ তায়ালার নামে খানা খাওয়া শুরু করছি এবং আল্লাহ তায়ালার বরকত প্রার্থনা করছি। (সাআলাবী)।

বিসমিল্লাহ ভুলে গেলে খাওয়ার মধ্যখানে পড়ার দোয়া:
হাদিস শরিফে এসেছে, খানা খাওয়ার শুরুতে কেউ বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলে, খাওয়ার মাঝখানে যখনই একথা মনে পড়বে, সঙ্গে সঙ্গে এই দোয়া পড়বে, 

بسم الله اوله واخره

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখেরাহ

অর্থ: আমি আল্লাহ তায়ালার নামে খানা খাওয়া শুরু করছি। প্রথমেও আল্লাহ তায়ালার নাম, পরিশষেও আল্লাহ তায়ালার নাম। (আবু দাউদ, আহমদ, দারেমী)।

সুতরাং একথা মনে কর না যে, খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ ভুলে গেলে আর অমনিতে সবকিছু শেষ হয়ে গেল। আল্লাহ তায়ালার নাম নেয়ার সময়ও বুঝি শেষ। না বরং খাওয়ার মাঝখানে যখনই মনে পড়বে, আল্লাহ তায়ালার নাম নিবে। 

মুসলমান ও কাফেরের খাওয়ার পার্থক্য:
একজন মুসলমানের খাওয়া এবং একজন কাফেরের খাওয়ার মাঝে এই হলো পার্থক্য। আল্লাহ তায়ালার অনুগত বান্দা ও এবং তার অবাধ্য বান্দার খানা খাওয়ার এই হলো পার্থক্য। একজন মুসলমানও খানা খান, আর একজন কাফেরও খানা খায়। কিন্তু খানা খাওয়ার সময় কাফেরের অন্তরে আল্লাহ তায়ালার কথা মনে পড়ে না, সব সময় তারা আল্লাহ তায়ালাকে ভুলে থাকে, খাবারের স্বাদ নেয়া এবং ক্ষুধা মিটানোই তার খানা খাওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য। যার ফলে কাফেরের খানা খাওয়া দুনিয়ার স্বাভাবিক কাজের মতোই হয়ে থাকে। অন্যদিকে একজন মুসলমান এবং আল্লাহ তায়ালার অনুগত বান্দা যখন খানা খায়, যেহেতু তার খানা খাওয়া আল্লাহ তায়ালার স্মরনের মধ্য দিয়ে হয়, তাই তার এই খাওয়া দাওয়া ইবাদতে পরিণত হচ্ছে।

খানা খাওয়ার পর এই দোয়া পড়বে:
খানা খাওয়ার পর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়া পড়তে বলেছেন,

الحمد لله الذى اطعمنا وسقانا وكفانا واواناوارواناوجعلنا من المسلمين

উচ্চারণ: আলহামদুলিল্লাহি আতআমানা, ওয়াসাকানা, ওয়াকাফানা, ওয়াআয়ানা, ওয়া আরওয়ানা, ওয়াজা আলানা মিনাল মুসলিমীন।

অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার যিনি আমাদেরকে খাইয়েছেন, পান করিয়েছেন, যথেষ্ট পরিমাণ খাবার দিয়েছেন, বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছেন, সকল প্রকার নেয়ামত দিয়েছেন এবং আমাদের মুসলমানদের অন্তর্ভূক্ত করেছেন।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, যখন খানা সামনে এসে ছিল তাখন এই দোয়া করেছিলাম, আল্লাহ তায়ালার শোকর যিনি আমাদেরকে রিজিক দান করেছে, আর এখানে দোয়া করা হচ্ছে, শোকর ও প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার, যিনি আমাদেরকে খানা খাইয়েছেন। এদ্বারা বোঝা যায়, দু’টিই আলাদা নেয়ামত। রিজিক প্রদান করা এক নেয়ামত, খানা খাওয়ানো আরেক নেয়ামত।

রিজিক দেয়া এক নেয়ামত খাওয়ানো আরেক নেয়ামত:
একথা নিশ্চিত যে, খাবার আল্লাহ তায়ালার প্রদত্ত দান। কিন্তু সেই দান মানুষ ভোগ নাও করতে পারে, যেমন কাফেরের কাছে আছে সব ধরনের নেয়ামতের উপস্থিতি, নানান পদের খানা । নানাজাতীয় ফল মূল। সুস্বাদু সব খাবার। কিন্তু তার পেটের পীড়া সবসময় লেগেই থাকে, ডাক্তার সবধরনের খাবার নিষেধ করে দিয়েছেন। বলেছেন, সাবধান, কোনো খাবারেই হাত লাগাবেন না। ডাক্তার শুধু স্যুপ খাওয়ার সীমিত অনুমতি দিয়েছেন। এই খানে رزقنا  (তিনি আমাদের কে খানা খাইয়েছেন) পাওয়া যাচ্ছে না, অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা রিজিক দিয়েছেন, কিন্তু খানা খাওয়ার তাওফিক দেননি।

জনৈক নবাব সাহেবের ঘটনা:
হজরত থানবি রহ. বলেন, লক্ষৌর একজন ধনাঢ্য নবাব সাহেবকে দেখেছি। আল্লাহ তায়ালা তাকে দুনিয়ার সকল নাজ নেয়ামত দান করেছিলেন, টাকা পয়সা, দালান কোঠা গাড়ি বাড়ি, চাকর নওকর কোনো কিছুর কমতি ছিল না তার। পেটের পীড়ার কারণে ডাক্তার তাকে স্যুপ ব্যতীত সকল প্রকার খাবার খেতে নিষেধ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে রিজিক দিয়েছিলেন কিন্তু খাওয়ার তাওফিক দেননি অর্থাৎ এখানে আমরা رزقنا পাচ্ছি ঠিকই কিন্তু اطعمنا পাচ্ছি না।

মোট কথা আল্লাহ তায়ালা রিজিক দান করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই রিজিক খাওয়ার তাওফিকও দিয়েছেন। এই দু’টি আলাদা নেয়ামত, অর্থাৎ রিজিক দেয়া এক নেয়ামত এবং খানা খাওয়ানো আলাদা এক নেয়ামত। একারণেই আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করা উচিত যে, আয় আল্লাহ আপনি আপনি রিজিক দান করেছেন তাই আপনার সানা ও শোকর আদায় করছি, আপনি খানা খাওয়ার তাওফিক দিয়েছেন, একারণেও আপনার শোকর ও কৃতজ্ঞতা আদায় করছি।

পানির নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়:
আলোচ্য দোয়ার পরবর্তী অংশ হলো,  وسقانا অর্থাৎ আয় আল্লাহ, আপনি আমাদেরকে পানি পান করিয়েছেন। তাই আপনার শোকরিয়া আদায় করছি। কোথাও যদি শুধু খাবার থাকে কিন্তু পান করার জন্য পানি না থাকে, তা হলে সেই খাবার আজাবে পরিণত হবে। একারণে আয় আল্লাহ, আপনার সানা ও শোকর আদায় করছি। আপনি আমাদেরকে খাবারও দিয়েছেন, আবার পানিও দিয়েছেন।

খানা যথেষ্ট হওয়ার কারণে শুকরিয়া আদায়:
দোয়ার তৃতীয় অংশে বলা হয়েছে, وكفانا আয় আল্লাহ, আপনার শুকরিয়া আদায় করছি, কেননা আপনি আমাদেরকে যথেষ্ট পরিমাণ খাবার দিয়েছেন। যথেষ্ট শব্দের এক অর্থ হলো, খানা এই পরিমান থাকা যদদ্বারা পরিবারের সকলের স্বাভাবিক প্রয়োজন পূরণ হয় এবং ক্ষুধা দূর হয়। আরেক অর্থ হলো খানা খাওয়ার সময় যে কোনো পেরেশানি ও দুশ্চিন্তা যুক্ত না হওয়া। কেননা এমনও হতে পারে যে, পর্যাপ্ত পরিমাণ খানা সামনে আছে, কিন্তু এরই মধ্যে কোনো দু:সংবাদ এসে পড়ল, কোনো প্রিয়জন কিংবা আত্মীয় স্বজনের মৃত্যু সংবাদ। বাস সঙ্গে সঙ্গে খানার স্বাদ মাটি হয়ে গেল, তা হলে বোঝতে হবে, এখাবার যথেষ্ট হয়নি।

বাসস্থানের নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়:
দোয়ার চতুর্থ অংশে বলা হয়েছে, واوانا আয় আল্লাহ আপনার শুকরিয়া আদায় করছি, কারণ, আপনি আমাদেরকে বসবাসের ঠিকানা দিয়েছেন। কেননা কারো যদি পানাহারের সকল সামগ্রী উপস্তিত আছে কিন্তু, বসবাসের ঠিকানা নেই। মাথা গোজার ঠাঁই নেই। তা হলে কিছুই নেই। তাই হে আল্লাহ, আপনার শোকর, আপনি আমাকে বসবাসের জন্য বাসা বাড়ি দিয়েছেন, প্রশান্তিতে থাকার জায়গা দিয়েছেন।

সকল নেয়ামত একত্র করার কারণে শুকরিয়া আদায়:
আলোচ্য দোয়ার পঞ্চম বাক্যে বলা হয়েছে, واروانا অর্থাৎ আয় আল্লাহ আপনার শোকর ও কৃতজ্ঞতা, কেননা আপনি আমাদেরকে ভরপুর নেয়ামত দান করেছেন। ভরপুর নেয়ামতে দ্বারা পানাহারের সকল প্রকার নেয়ামত উদ্দেশ্য। সে সব কিছু আপনি আমাদের জন্য একত্র করে দিয়েছেন।

ইসলাম নামক নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়:
তারপর সর্বশেষ বাক্যে বলা হয়েছে, وجعلنا من المسلمين আয় আল্লাহ, সকল হামদ ও শোকর আপনার জন্য, কারণ আপনি আমাদের কে মুসলমান বানিয়েছেন। এই নেয়ামত পূর্বোক্ত সকলে নেয়ামতের মধ্যে শ্রেষ্ট। কেননা, আমদের জন্য যদি পানাহারের সকল সামগ্রী সহজ লভ্য হতো, সহজেই আমরা তৃপ্তির সঙ্গে খানা খেতে পারতাম। পান করতে পারতাম। মাথাগোজার ঠাঁই ঠিকানার ব্যবস্থা হলো। কিন্তু যদি ঈমানের দৌলত না থাকত, তা হলে অন্য সকল নেয়মত অর্থহীন হয়ে পড়ত। ঈমান ব্যতীত সকল নেয়ামতের পরিনাম হলো জাহান্নামের আজাবের সুরত ধরে আমাদের সামনে হাজির হতো। 

তাই হে আল্লাহ! আপনার শোকর, আপনি আমাদেরকে এসব নেয়ামত দান করেছেন। আমাদের কে মুসলমান বানিয়েছেন। ঈমান ও ইসলামের তাওফিক দান করেছেন।

মর্মের ভুবন লুকিয়ে আছে:
দেখুন আলোচ্য দোয়ার বাক্যসমূহ কয়েক সেকেন্ডে পড়া সম্ভব। কিন্তু এসব বাক্যের মাঝে লুকিয়ে আছে অর্থ ও মর্মের বিস্তৃত ভূবন। আল্লাহ তায়ালার যেই বান্দা প্রতিবেলা খানা খাওয়ার পর আল্লাহ দরবারে এই দরখাস্ত পেশ করবে এবং এভাবে শুকরিয়া আদায় করবে, কখনোই আল্লাহ তায়ালা তাকে এসব নেয়ামত থেকে বিরত করবেন না। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা এমন কৃতজ্ঞ বান্দার ওপর দয়ার আচরণ করবেন, এবং তার দুনিয়া আখেরাত সুন্দর করে সাজিয়ে দেবেন। একারণেই নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে এই দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন।

সার কথা: 
দোয়াটি বেশ সংক্ষিপ্ত, তবু প্রত্যেক মুসলমান যদি গুরুত্বসহ এর ওপর আমল করে, এবং এই খেয়াল করে দোয়াটি পড়ে যে, এই সব নেয়ামত আল্লাহ তায়ালার দান। আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য এর মধ্যে বরকত দিয়েছেন। তা হলে তার প্রতিটি লোম আল্লাহ তায়ালার শোকর আদায় করবে, আর শোকর আদায়ের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা হলো ।لئن شكرتم لأزيدنكم তোমরা যদি শুকরিয়া আদায় কর তা হলে অবশ্যই আমি তোমাদের কে আরো বেশি দেব। (সূরা: ইব্রাহিম, আয়াত: ৭)।

আল্লাহ তায়ালা তার ফজল ও করমে, দয়া ও অনুগ্রহে আমাদের সকলকে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই শিক্ষা এবং অন্যসকল শিক্ষার ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –