ব্রেকিং:
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ই-পাসপোর্ট বিতরণ কর্মসূচির উদ্বেধন করলেন প্রধানমন্ত্রী। ভারতে বিতর্কিত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) বাতিল করার জন্য করা ১৪৪টি মামলার শুনানি চলছে দেশটির সুপ্রিমকোর্টে।

বুধবার   ২২ জানুয়ারি ২০২০   মাঘ ৯ ১৪২৬   ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

৩২

দখলদারদের হাতে জিম্মি বিশ্বের একমাত্র ফাইলেরিয়া হাসপাতাল

প্রকাশিত: ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯  

নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরের বিশ্বের একমাত্র ফাইলেরিয়া হাসপাতালটি স্থানীয় দখলদারদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েছে ফাইলেরিয়া রোগীরা। ফাইলেরিয়া নির্মূলের উদ্দেশ্য নিয়ে সরকার এবং দাতা সংস্থা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এই হাসপাতালটি নির্মাণ করলেও তা দখলদারদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। যার ফলে ফাইলেরিয়া রোগীর সঠিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চলের মানুষ।

বর্তমানে ফাইলেরিয়া রোগের বিশেষজ্ঞ ছাড়াই এই হাসপাতালটি প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ জন রোগীর চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। প্রতি শুক্রবার সেখানে ফাইলেরিয়া রোগের অপারেশন করা হচ্ছে ভাড়াটিয়া ডাক্তার নিয়ে এসে। এদিকে ফাইলেরিয়া হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন অবৈধ দখলদারের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রাণালয়, ডিজি র‌্যাব, স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নীলফামারী জেলা প্রসাশক, সিভিল সার্জন,রংপুরের বিভাগীয় পরিচালক স্বাস্থ্য, বিভাগীয় কমিশনারসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন দিয়েছেন। অন্যদিকে আইএসিআইবি এর পক্ষ থেকে হাসপাতালটির পরিচালনার জন্য বিপিডিএ এর মহাসচিবকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে

সরেজমিনে দেখাগেছে ,এ্যাম্বুলেন্স, অপারেশন থিয়েটার, দামী চিকিৎসার যন্ত্রাদি অকেজে হয়ে পড়ে আছে। অনেক দামী-দামী জিনিসপত্র ব্যবহার না হওয়ায় মরিচে ও জরাজীর্ণ অবস্থায় মাকসাড় বাসা বেঁধেছে।

এক সময় হাসপাতালটিতে উত্তরের ৮ জেলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসত। এখন দখলদারদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ায়  প্রায় ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটির বেড থাকলে তা ফাঁকা পড়ে আছে। এক সময় বিশ্বের একমাত্র ফাইলেরিয়া হাসপাতালে রোগীর পরিপূর্ণ ও গিজগিজ অবস্থা বিরাজ করলেও  এখন তা ভূতের বাড়িতে পরিণত হয়েছে।  

ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগ বাংলাদেশের একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে নারীরা এ রোগের কারণে সমাজে নানাভাবে হচ্ছে উপেক্ষিত। কারো কারো সংসারও ভেঙে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন ধরনের ফাইলেরিয়াল প্যারাসাইট বা পরজীবী শরীরে প্রবেশ করলে এ রোগের সৃষ্টি হয়। এ ধরনের পরজীবী একজন রোগী হতে আরেকজন সুস্থ লোকের শরীরে কয়েক প্রজাতির মশার কামড়ে সংক্রামিত হয়। এ রোগের লক্ষণগুলো হলো তীব্র এবং ঘন ঘন কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে যা আপনি আপনি সেরে যায়। আক্রান্ত লসিকা গ্রন্থির প্রদাহের কারণে লসিকা গ্রন্থিতে ব্যথা, লাল হয়ে যাওয়া এবং লসিকা নালী ফুলে যাওয়া। গোদ হলে সাধারণত শরীরের হাত-পা বা পুরুষের অ-কোষ, নারীর স্তন ও যৌনাঙ্গ অর্থাৎ সম্ভাব্য অক্রান্ত স্থানগুলো (হাতির পায়ের মতো) অস্বাভাবিক মোটা হয়ে যায়।

এ রোগ নির্মূলে সরকারের সমাজসেবা অধিদফতর ও এনজিও বিষয়ক ব্যুরো কর্তৃক নিবন্ধন নিয়ে কাজ শুরু  করেন বাংলাদেশের একমাত্র ‘ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড কিনিক্যাল ইমুনোলজি অব বাংলাদেশ’ (আইএসিআইবি)। ১৯৯৫ সালের ১৫ জানুয়ারি স্বেচ্ছছাসেবী ও অলাভজনক এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠে। এ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান  অধ্যাপক ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জাপান সরকারের অর্থায়নে সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ধলাগাছে ফাইলেরিয়া হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ৬৯.৫ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তোলা হয় এ হাসপাতালটি। পরবর্তীতে দাতা সংস্থার দেয়া অনুদানের প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে তিন ও চার তলা বিশিষ্ট অত্যাধুনিক মডেলের দুইটি ভবন নির্মাণ করা হয়।

কিন্তু কতিপয় লোকের সুবিধার্থে অধ্যাপক ডাঃ মোয়াজ্জেমকে সরিয়ে দিয়ে বিশ্বের একমাত্র  ফাইলেরিয়া হাসপাতালটির একাংশ জমি দাতার জামাতা গ্রাম্য পশু ডাক্তার সুরুত আলীকে নাম মাত্র পরিচালক হিসাবে বসিয়ে এই হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার সম্পদ অবৈধ্য ভাবে দখল করে বসে আছে।

মূলত একটি সিন্ডিকেট চক্র ফাইলেরিয়া হাসপাতালটি নিয়ে বাণিজ্য করছে। আর এই সিন্ডিকেটের মূলহোতা হচ্ছে  নারী কেলেংকারীর দায়ে বরখাস্ত হওয়া কো-অডিনেটর  তোফায়েল হোসেন বিপ্লব। তাকে ডাঃ মোয়াজ্জেম সাহেব বরখাস্ত করলেও তিনিই এখন এই ফাইলেরিয়া হাসপতালে মূল দায়িত্ব পালন করছেন।

রংপুর মোসলেম পাড়া থেকে আসা ফাইলেরিয়া রোগী রাসুলা বেগম (৫৫) বলেন, ২০ বছর ধরে এই রোগে ভূগছি। ৫ মাসে এই হাসপাতারে  ৪ বার এসেছি। প্রতি মাসে ১৮শ টাকার ঔষুধ খেতে হয়। রোগ নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। সামান্য একটু ব্যথা কমেছে।

জয়পুরহাট জেলা সদর থেকে মর্তুজা রহমান তার ১৭ বছরের ছেলে আনান মিয়া চিকিৎসার জন্য নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন আমি ভারতের ব্যঙ্গালোরে আমার ছেলের অপারেশন করিয়ে ছিলাম কিন্তু ভালো হয়নি। সেখানে পরামর্শ দেন আনাদের এলাকায় এই রোগীর চিকিৎসা হয়। সেখানে নিয়ে চিকিৎসা করান। কিন্তু জানতে পারি হাসপাতাল  নিয়ে দ্ব›েদ্বর কারণে ফাইলেরিয়া বিশেষজ্ঞ ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন আর এখানে আসেন না। ওনাকে হয়তো দেখাতে পারলে আমার ছেলেটি পুরোপুরি সুস্থ্য হত।

ওয়ার্ড বয় আব্দুল হামিদ বলেন, গরমের সময় প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী আসে। শীতকালে ফাইলেরিয়া রোগীরা হাসপাতালে কম আসে তার পরেও  এখন ২০ থেকে ৩০ জন  রোগী আসে।

হাসপাতালের স্টাফ নার্স শামছুন্নাহার বলেন, আমাকে একা নার্সের দায়িত্ব পালন করতে হয়। রোগীর উপর সামান্য কিছু কমিশন পেয়ে থাকি তা দিয়ে সংসার চলে না কাজ নেই তাই বেকার দিচ্ছি।

কো-অডিনেটর তোফায়েল হোসেন বলেন, সুরুত আলীর পরিচালকের পদ থাকলেও তাকে ম্যানেজার পদ দিয়ে বেতন ভাতা দেয়া হয়। আসলে সুরুত আলী নামে মাত্র পরিচালকের হিসাবে আছেন। সব কাজ তিনিই করেন। এবং তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে নারী কেলেংকারীর ঘটনা মিথ্যা ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তিনি এই হগাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করলেও তার বিরুদ্ধে অর্থ আতœসাতে অনেক অভিযোগ আছে। (আইএসিআইবি) এনজিও মাধ্যমে হাসপাতালটি নির্মাণ হলেও তার কোন অস্তিত্ব না থাকায় তিনি পুরো হাসপাতালটি পরিচালনা করছেন।

ফাইলেরিয়া হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাঃ রায়হান তারেক বলেন আমার একার পক্ষে এত বড় হাসপাতালের  রোগীর চিকিৎসা সেবা দেয়া কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছে। সরকার যদি ডিপুটিশনে কিছু চিকিৎসক দিত তাহলে এই হাসপাতালটির সেবার মানও বাড়ত।  প্রতিশুক্রবার বিভিন্ন জায়গা থেকে ডাঃ নিয়ে এসে হাইড্রসিল অপারেশন করা হয়ে থাকে।

বিপিডিএ এর মহাসচিব রাকিবুল ইসলাম তুহিন বলেন, ফাইলেরিয়া হাসপাতালের প্রতিষ্ঠা সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন  আমাকে উক্ত হাসপাতালটি পরিচালনার জন্য দায়িত্ব দিয়েছে। অবৈধ্য দখলদার হাত থেকে উদ্ধার করে আগের মত পরিপূর্ণ হাসপাতালটি পরিচলনা করা সম্ভব হবে।

বর্তমান দায়িত্ব প্রাপ্ত পরিচালক সুরুত আলী বলেন, সরকারি সুযোগ সুবিধার পাওয়ার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। হয়তো অল্প কিছু দিনের মধ্যে সরকারি অনুদান পেয়ে যাবে। আমরা আরও আগেই সরকারি অনুদান পেতাম যাদি ডাঃ মোয়াজ্জেম বিরোধীতা না করত। হাসপাতালের বেহাল দর্শার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এত বড় হাসপাতাল চালাইতে বেশ অর্থের প্রয়োজন। সরকারি অনুদান পেলে ভালো ভাবে চালাতে পাবে।

স্বাস্থ্য রংপুর বিভাগের পরিচালক ডাঃ মোস্তফা খালিদ আহমেদ বলেন, সৈয়দপুর ফাইলেরিয়া হাসপাতালটি বিশ্বের প্রথম হাসপাতাল। ফাইলেরিয়া একটি সংক্রামক রোগ। স্বাস্থ্য বিভাগের সংক্রমক দপ্তরে আমি এই হাসপাতালটির বিষয়ে সুপারিশ করবো। যাতে এই হাসপাতালে সকল ধরণের সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়। আর যদি কেউ এটিকে অবৈধ্য ভাবে দখল করে থাকে তাহলে আইনগত ভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –
এই বিভাগের আরো খবর