ব্রেকিং:
দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ কমাতে চলমান ‘কঠোর লকডাউনের’ মেয়াদ আরো এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। ভাঙচুরের মামলায় হেফাজত নেতা মামুনুল হকের সাত দিনের রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
  • সোমবার   ১৯ এপ্রিল ২০২১ ||

  • বৈশাখ ৬ ১৪২৮

  • || ০৬ রমজান ১৪৪২

সর্বশেষ:
চলমান `কঠোর লকডাউন` আরো এক সপ্তাহ বাড়ল পুলিশের উদ্যোগে ৫ টাকায় ইফতার যাত্রা শুরু ১১০০ শয্যার করোনা হাসপাতালের সারাদেশে চার কার্যদিবসে ভার্চুয়ালি ৯০৪৬ জনের জামিন আজ ৬ষ্ঠ দিনের মতো সারাদেশে চলছে সর্বাত্মক লকডাউন

নীলফামারীতে সূর্যমুখীতে কৃষকের হাসি 

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ১২ মার্চ ২০২১  

নীলফামারী জেলা সদরের কুন্দুপুকুরে ১৭ বিঘা জমিতে একটি প্লট করে সূর্যমুখী চাষ সাড়া ফেলেছেন বেশ কিছু কৃষক। গাছে গাছে ফুটেছে ফুল। প্রাকৃতিক স্বর্গ সৃষ্টি করে দাঁড়িয়ে আছে সূর্যমূখী। এ যেন এক ফুলের স্বর্গরাজ্য, এখানে এলে যে কারো মন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠবে। সবুজে ঘেরা প্রকৃতির মাঝে হলুদ রঙের সূর্যমুখী দূর থেকে যে কারো মনকেড়ে নেবে। তাই সূর্যমূখী মাঠে দর্শনার্থীদের পদচারণা বেড়েছে। মাঠে কৃষকের স্বপ্ন সূর্যমূখী ফুলে রঙিন হয়েছে। সূর্যমূখীর বাম্পার ফলন গ্রামীণ অর্থনীতিতে সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। সূর্যমুখী দেখতে রূপময় নয় গুণেও অনন্য। সূর্যমুখীর বীজের তেল স্বাস্থ্যর জন্য অসাধারণ। অন্যান্য তেলবীজে যেসব ক্ষতিকারক উপাদান (বিশেষ করে কোলেস্টেরল) থাকে সূর্যমুখীতে তা নেই। বরং আরও উপকারী উপাদান ও পুষ্টিগুণ বিদ্যমান।

কৃষিতে একের পর এক বিপ্লব সৃস্টি করছে বর্তমান সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় কৃষিতে সাফল্যে মুজিববর্ষের অঙ্গীকার হিসাবে  সূর্যমুখী  চাষে নতুন স্বপ্ন দেখছে কৃষক। আর্থিকভাবে লাভবানের হাতছানী দিয়েছে কৃষকদের কাছে সূর্যমুখী। সূর্যমুখী ফুলের বীজ থেকে সহজে উন্নত মানের তেল ও খৈল উৎপাদন হয়। পাশাপাশি পুষ্টিকর সবজি হিসেবেও সূর্যমুখী জনপ্রিয়। তাছাড়া এই ফুলের মাধ্যমে মৌচাক বসিয়ে বাণিজ্যিকভাবে মধু উৎপাদন করা সম্ভব। সেই সাথে জ্বালানির চাহিদা পূরণেও ভুমিকা আছে। সূর্যমুখী বীজ রোপণের ১২০ দিনের মধ্যে কৃষকেরা ফুল থেকে বীজ ঘরে তুলতে পারেন। প্রতি বিঘা জমিতে ছয় থেকে সাড়ে ছয় মণ বীজ পাওয়া যায়। বিঘাপ্রতি কৃষক ১০-১১ হাজার টাকার বীজ বিক্রি করতে পারেন। সূর্যমুখীর প্রতিকেজি বীজ থেকে কমপক্ষে আধা লিটার তেল উৎপাদন সম্ভব। প্রতি শতক জমিতে ৮ কেজি বীজ উৎপাদন হয়। এতে তেল উৎপাদন হবে সাড়ে ৩ থেকে ৪ লিটার পর্যন্ত। প্রতি লিটার তেলের সর্বনিম্ন বাজার মূল্য ২৫০ টাকা। প্রতি শতক জমিতে খরচ হয় সর্বোচ্চ ২০০ টাকা। স্বাস্থ্য রক্ষা ও রোগ জীবাণু প্রতিরোধে এই ফুলের উৎপাদিত তেলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। 

কৃষি কর্মকতার্রা জানান, নদী বহুল চরভুমির বেশির ভাগে সূর্যমুখী চাষের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে সূর্যমুখীচাষ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে।
এ বছর নতুন চমক হিসাবে সরকারি ভাবে কৃষি বিভাগের পক্ষে কৃষকদের এই প্রথমবারের মতো যোগ করা হয়েছে সূর্যমুখী চাষ। রাজস্ব ফলোআপ ও প্রণোদনা কর্মসূচি-২০২১ এর আওতায় সূর্যমুখী আবাদ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। তাছাড়া তামাকের চেয়ে সূর্যমুখী চাষের লাভ বেশি। কারণ সূর্যমুখীর ফলও বীজ দুটোই বিক্রিযোগ্য। 
সুত্রমতে, কৃষি পুনবার্সনে ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে নীলফামারী জেলায় এক হাজার ৮০০ বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে। এরমধ্যে কৃষি পুনর্বাসনে এক হাজার ৩০০ বিঘা ও কৃষি প্রনোদনায় ৫০০ বিঘা। এতে গড় উৎপাদন ধরা হয়েছে বিঘাপ্রতি ২৬৬ কেজি অর্থাৎ ৬ দশমিক ৬৫ মন। এ ছাড়া সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী কৃষকরা সরকারী ভাবে পেয়েছেন বীজ,সার ও উৎপাদনের খরচ। এবার যে সকল কৃষক সূর্যমুখী চাষ করেছেন সেই সকল কৃষক আগামী আউস ও আমন মৌসুমেও  সরকারের প্রণোদনার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন।
 শুক্রবার(১২ মার্চ/২০২১) দুপুরে সূর্যমুখীর হাঁসিতে হাসছে নীলফামারী সদরের কুন্দপুকুর ইউনিয়নের শেখপাড়া ফাকিরপাড়ার গুড়গুড়ি ব্লক। এখানে ১৭ বিঘার একটি প্লটে সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে। এই ১৭ বিঘা জমিতে কৃষক গোলাম রব্বানীর নেতৃত্বে ১১ জন কৃষক ১১ বিঘায় ও কৃষক খাদেম আলীর নেতৃত্বে ৫ জন কৃষক ৫ বিঘা জমিতে এই আবাদ করেছেন। ভোর হলেই সোনা রোদে চোখ মেলে ঝলমলে সূর্যমুখী। সূর্য মামার সঙ্গে জেগে উঠে সূর্যমুখীর হলুদ আভা। সবুজ পাতার আড়ালে মুখ উচু করে আছে সূর্যমুখী। দেখতে কিছুটা সূর্য্যের মত। সূর্য্যের দিকে মুখ করে থাকে বলে তাই এ ফুলের নাম সূর্যমুখী। এ ফুলে বাগানে প্রায় প্রতিদিন বসে প্রজাপতি আর মৌমাছির মেলা। নয়ন জুড়ানো এ দৃশ্য মোহিত করছে সবাইকে। এ ফুল দেখতে যেমন অদ্ভুত আকষর্ণীয়, তেমনি রয়েছে তার হাজারো গুনাগুণ। 
দৃষ্টিনন্দন এই সূর্যমুখী ফুলের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন আসছেন দূর-দূরান্তের সৌন্দর্য পিপাসুরা। আগ্রহী কৃষকরা সূর্যমুখী বীজের উৎপাদনের মাধ্যমে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে চান। তারা চান দেশে গড়ে উঠুক সূর্যমুখী তেল উৎপাদনের কারখানা। রংপুর কৃষি অঞ্চলে কৃষিবিভাগ বীজ সার ও পরামর্শ দিয়ে নতুন এই সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলছেন ।

নীলফামারীতে সূর্যমুখী চাষী গোলাম রব্বানী জানান, সুর্যমুখী আবাদ এইবারই তিনি প্রথম করছেন। এটি নতুন স্বপ্ন তার। সরকারী প্রনোদনায় এই বøকে ১৭ জন কৃষক ১৭ বিঘা জমিতে একটি প্লট করে এক সঙ্গেই ঢালাওভাবে সুর্যমুখী আবাদ করছেন। সূর্যমুখীর যে ফুল এসেছে তা দেখে ভাল ফলনের আশা করছেন এই উদ্যোক্তা। তিনি চান সূর্যমুখী তেলের কারখানা গড়ে উঠুক আর সেখানে এ জেলার কৃষকরা সেখানে বীজ বিক্রি করে লাভবান হোক।  কৃষক খাদেম আলী শেখ জানান, সূর্যমুখী চাষে বিঘাপ্রতি চার হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন ভালো হলে এক বিঘা জমিতে কমপক্ষে সাত মণ বীজ হবে। প্রতিমণ বীজ সাড়ে তিন হাজার হতে ৪ হাজার  টাকায় বাজারে বিক্রি হবে। অন্যান্য আবাদের চেয়ে সূর্যমুখী অনেক লাভজনক। 

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সূর্যমুখী একধরণের একবর্ষী ফুলগাছ। সূর্যমুখী গাছ লম্বায় ৩ মিটার (৯.৮ ফুট) হয়ে থাকে। ফুলের ব্যাস ৩০ সেন্টিমিটার (১২ ইঞ্চি) পর্যন্ত হয়। এ বীজ হাঁস মুরগির খাদ্যরূপে  ও তেলের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বীজ যন্ত্রে মাড়াই করে তেল বের করা হয়। সূর্যমুখীর চাষ সারা বছর করা যায়। দেশের উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলে তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রী সে. এর নিচে হলে ১০-১২ দিন পরে বীজ বপন করতে হয়। খরিপ-১ মৌসুমে অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠ (মধ্য-এপ্রিল থেকে মধ্য-মে) মাসেও এর চাষ করা যায়। এক হাজার বীজের ওজন ৬০-৬৫ গ্রাম। বীজের রঙ কালো এবং লম্বা ও চ্যাপ্টা। প্রতি গাছে একটি করে মাঝারি আকারের ফুল ধরে থাকে। বপনের পর ফসল সংগ্রহ করতে-১২০ দিন সময় লাগে। 
সূর্যমুখী ফুল থেকে পাখির খাবারের পাশাপাশি কোলেস্টেরল মুক্ত তেল উৎপাদন করে ক্ষতিকর পাম অয়েল ও সয়াবিনের স্বাস্থ্যঝুকি থেকে রক্ষা পাবে মানুষ।
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) মোছাঃ হোমরায়রা মন্ডল বলেন, 
সরকারী প্রনোদনা ও রাজস্বখাতে এবার ব্যাপক সূর্যমুখী চাষ হয়েছে। গত বছর রাজস্ব খাতে অল্প কিছু আবাদ করা হয়েছিল। এতে দেখা যায় এই অঞ্চল সূর্যমুখী চাষের জন্য আবহাওয়া ও মাটি যথযথ উপযোগী। ফলে চলতি বছরেও সরকারী প্রনোদনায় কৃষকদের মাধ্যমে ব্যাপক ভাবে সূর্যমুখী চাষ বাড়ানো হয়। এটি একটি ভাল তেল ফসল।

তিনি আন্তর্জাতিক পুষ্টিবিদদের দেওয়া অনলাইন তথ্যসূত্র উল্লেখ করে জানান, সূর্যমুখী তেলে আছে মানবদেহের জন্য উপকারী ওমেগা ৯ ও ওমেগা ৬, আছে অলিক অ্যাসিড। সূর্যমুখীর তেলে আছে শতকরা ১০০ ভাগ উপকারী ফ্যাট। আরও আছে কার্বোহাইড্রেট প্রোটিন ও পানি। সূর্যমুখীর তেল সম্পূর্ণ ক্ষতিকারক কোলেস্টেরলমুক্ত। আছে ভিটামিন -ই .ভিটামিন -কে এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন। আছে মিনারেল। মুখের যত্নে দাঁতের জন্য উপকারী একমাত্র তেল। হৃদরোগী, ডায়াবেটিসের রোগী উচ্চ রক্তচাপের রোগী, কিডনি রোগীর জন্যও সূর্যমুখীর তেল নিরাপদ। চমৎকার এনার্জির উৎসও সূর্যমুখীর তেল।