• বুধবার   ২৭ মে ২০২০ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪২৭

  • || ০৪ শাওয়াল ১৪৪১

সর্বশেষ:
নিলুফার মঞ্জুরের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক যে কোনো সময় ‘দ্বিতীয় ঝড়’ শুরু হবে: ডাব্লিউএইচও বাংলাদেশের তৈরী ৬৫ লাখ পিপিই গেল যুক্তরাষ্ট্রে করোনা: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রোগীদের খাবার পাঠালেন জেলা প্রশাসক সরকারি নির্দেশনায় ঈদের নামাজ আদায়: মুসুল্লীদের ধন্যবাদ
১০৬

নুহ জাতির ওপর মহাপ্লাবন ও উম্মতে মুহাম্মদির শিক্ষা   

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ৩১ মার্চ ২০২০  

পৃথিবীতে আল্লাহর যতো গজব নাজিল হয়েছিল নুহ (আ.) এর সময়ের মহাপ্লাবন এর অন্যতম। এই ঘটনা ছিল মানবজাতির জন্য একটি মহা দৃষ্টান্ত ও শিক্ষা। যা পৃথিবীতে এক নতুন সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। আল কোরআনের একাধিক স্থানে নুহ (আ.) এর সময়ের মহাপ্লাবনের বর্ণনা এসেছে।
পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থেও গুরুত্বের সঙ্গে নুহ (আ.) মহাপ্লাবনের ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। কোরআনের বর্ণনা মতে, নূহ (আ.) এর জাতি আল্লাহ ও তাঁর নবীর প্রতি সীমাহীন ঔদ্ধত্য প্রকাশ করায় আল্লাহ তাদের সমূলে ধ্বংস করেন। তার আগে তিনি নুহ (আ.)-কে প্রকাণ্ড এক নৌকা তৈরির নির্দেশ দেন। নূহ (আ.) এর জাতি নৌকা তৈরিসহ মুমিনদের প্রস্তুতি দেখে হাসাহাসি করে এবং তাতে বাধা প্রদানের চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ অবাধ্যদের ডুবিয়ে হত্যা করেন এবং মুমিনদের রক্ষা করেন। মুমিনদের সঙ্গে পশু-পাখিদেরও আল্লাহ রক্ষা করেন। অবিশ্বাসীদের দলভুক্ত হওয়ায় নুহ (আ.) এর এক সন্তানও মহাপ্লাবনে মারা যায়।

নুহ (আ.) এর পরিচয় :

আল্লাহর প্রেরিত পুরুষদের ভেতর প্রথম রাসুল নুহ (আ.)। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সর্বপ্রথম শরীয়ত দান করেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, এক দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, কেয়ামতে দিশাহারা মানুষ নুহ (আ.)-কে বলবে, আপনি পৃথিবীতে প্রেরিত প্রথম রাসূল। আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪৩১২)।

আবু উমামা (রা.) এর বর্ণনা মতে, আদম (আ.) এর আগমনের এক হাজার বছর পর নুহ (আ.) এর আগমন হয়। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ১৪/৪০)। ঐতিহাসিকদের মতে, নুহ (আ.) এর জাতির নাম ছিল রাসিব। তারাই পৃথিবীতে প্রথম শিরক ও মূর্তিপূজার প্রচলন করে। আধুনিক যুগের ইতিহাস গবেষকদের ধারণা, খ্রিস্টপূর্ব দুই থেকে চার হাজার বছর আগে নুহ (আ.) এর আগমন হয়।

নুহ আ. এর উম্মতের পরিচয় :

তার সম্প্রদায়ের লোকেরা ইতোপূর্বে ঈমানদার ছিলেন, এক আল্লাহর ইবাদত করত, পরকালে বিশ্বাসী ছিলেন, তারা ভালো কাজ করতেন, সেসব লোক মারা গেলেন। লোকজন তাদের সততা ও আখলাকের কারণে চিন্তিত হলেন। তারা সেসব লোকের মূর্তি বানালো, তারা তাদের নামকরণ করলো ওয়াদ, সুয়া’হ, ইয়াগুছ, ইয়াউক, নসর ইত্যাদি। লোকজন এসব মূর্তির কথা ভুলে গেল, তারা এগুলোকে সেসব মৃত্যুবরণকারী সৎ লোকের চিহ্ন হিসেবে গণ্য করতে লাগল। শহরের লোকজন ওইসব মৃত ব্যক্তিদের সম্মানে এসব চিত্রগুলোকে সম্মান করতে লাগল। এভাবে যুগের পর যুগ চলতে লাগল, এক সময় পিতাদের মৃত্যু হলো ও সন্তানেরা বৃদ্ধ হলো, তারা এসব মূর্তিগুলোকে আরো সম্মান করে নিজেদের কাছে নিয়ে এলো, তাদের সামনে রাখল, এভাবে মূর্তিগুলো ওই সম্প্রদায়ের নিকট অনেক সম্মানের পাত্রে পরিণত হলো। এরপর পরবর্তী প্রজন্ম এলো, তারা এসবের ইবাদত করা শুরু করল, বলতে লাগল যে, এসব ইলাহদের সিজদা করতে হয়, তাদের সামনে নতজানু হতে হয়, ফলে তারা সে সবের ইবাদত করত। এভাবেই তাদের অনেকে পথভ্রষ্ট হলো। এ পর্যায়ে নুহ জাতির কথা কোরআনের আলোকে তুলে ধরছি।

এমতাবস্থায় তাদের নিকট হজরত নুহ (আ.)-কে পাঠালেন, তিনি তাদেরকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন, মূর্তির পূঁজা করতে নিষেধ করলেন, তাদেরকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান করলেন, নুহ (আ.) জাতির কাছে এসে বললেন, সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর বন্দেগী কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোনো মাবুদ নেই।’ (মু’মিনুন: ২৩)।

লোকেরা তাকে মিথ্যারোপ করল, তিনি তাদেরকে আল্লাহর আজাব থেকে সতর্ক করলেন, তিনি বললেন, আমি তোমাদের জন্যে মহাদিবসের শাস্তিু আশংকা করি। (শুয়ারা: ১৩৫)।

তারা জবাবে বলল, তার সম্প্রদায়ের সর্দাররা বলল, আমরা তোমাকে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতার মাঝে দেখতে পাচ্ছি। (আ’রাফ: ৬০)।

নুহ (আ.) তাদেরকে প্রতিউত্তরে বললনে, সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়, আমি কখনও ভ্রান্ত নই; কিন্তু আমি বিশ্বপ্রতিপালকের রাসূল। তোমাদেরকে প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছাই এবং তোমাদেরকে সদুপদেশ দেই। আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমনসব বিষয় জানি, যেগুলো তোমরা জান না। (আ’রাফ: ৬১-৬২)

নূহ (আ.) এর কথা শুনে লোকজন আশ্চর্য হলো, তারা বলতে লাগল, তুমি তো আমাদের মতই মানুষ, কিভাবে তুমি আল্লাহ নিকট হতে প্রেরিত হলে? আর যেসব লোক তোমার অনুসরণ করে তারা অধিকাংশই নিম্ন শ্রেণির লোক, আমাদের ওপর তাদের কোনো মর্যাদা নেই, তুমি আমাদের থেকে বেশি মাল ও সম্মানের অধিকারীও নও, আমরা মনে করি তোমরা যা দাবী কর তা মিথ্যা। সম্প্রদায়ের কেউ কেউ বলতে লাগল, এ তো তোমাদের মতই একজন মানুষ বৈ নয়। সে তোমাদের ওপর নেতৃত্ব করতে চায়। আল্লাহ ইচ্ছা করলে ফেরেশতাই নাজিল করতেন। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে এরূপ কথা শুনিনি। সে তো এক উম্মাদ ব্যক্তি বৈ নয়। (মু’মিনুন: ২৪-২৫)।

সম্প্রদায়ের লোকজন একে অন্যকে মূর্তি পূঁজা করতে উৎসাহিত করল, তারা বলছে, তোমরা তোমাদের উপাস্যদেরকে ত্যাগ করো না এবং ত্যাগ করো না ওয়াদ, সূয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নসরকে। (নুহ: ২৩)।

নুহ (আ.) তাদেরকে বললেন, তোমরা কি আশ্চর্যবোধ করছ যে, তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের মধ্য থেকেই একজনের বাচনিক উপদেশ এসেছে যাতে সে তোমাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করে। (আ’রাফ: ৬৩)।

নুহ (আ.) নম্র ও উদারভাবে বলতে লাগলেন, কিন্তু এতে সম্প্রদায়ের লোকদের অহংকারই বৃদ্ধি পেল, কিন্তু তিনি তাদেরকে সব সময় ডাকতে লাগলেন, তিনি বললেন, সে বলল, হে আমার পালনকর্তা! আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবারাত্রি দাওয়াত দিয়েছি, কিন্তু আমার দাওয়াত তাদের পলায়নকেই বৃদ্ধি করেছে। আমি যতবারই তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি, যাতে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, ততবারই তারা কানে অঙ্গুলি দিয়েছে, মুখমন্ডল বস্ত্রাবৃত করেছে, জেদ করেছে এবং খুব ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছে। (নুহ: ৫-৭)।

তাদেরকে সম্ভাব্য সব ধরণের পদ্ধতিতে ডাকলেন, অতঃপর আমি ঘোষণাসহকারে প্রচার করেছি এবং গোপনে চুপিসারে বলেছি। অতঃপর বলেছি, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। (নুহ: ৯-১০)।

কেউ কেউ তুচ্ছ ওজরও পেশ করতে লাগল, তারা বলল, আমরা কি তোমাকে মেনে নেব যখন তোমার অনুসরণ করছে ইতরজনেরা? (শুয়ারা: ১১১)।

এদের জবাবে নুহ (আ.) উদার ও উপদেশের ভাষায় বললেন, নুহ বললেন, তারা কি কাজ করছে, তা জানা আমার কি দরকার? (শুয়ারা : ১১২)।

তাদেরকে বললেন, তাদের হিসাব নেয়া আমার পালনকর্তারই কাজ; যদি তোমরা বুঝতে! (শুয়ারা : ১১৩)।

নুহ (আ.) আরো বললেন, আমি মুমিনদেরকে তাড়িয়ে দেয়ার লোক নই। (শুয়ারা: ১১৪)। আমি কিন্তু ঈমানদারদের তাড়িয়ে দিতে পারি না (হুদ : ২৯)।

আমি কিভাবে সেসব লোকদেরকে তাড়িয়ে দদেব যারা আমার ওপর ঈমান আনল, আমাকে সাহায্য করল, আমার দাওয়াতি কাজ প্রসারে সহযোগিতা করল। তিনি তাদেরকে বললেন, আর হে আমার জাতি! আমি যদি তাদের তাড়িয়ে দেই তাহলে আমাকে আল্লাহ হতে রেহাই দেবে কে? তোমরা কি চিন্তা করে দেখ না? (হুদ :  ৩০)।

আমি তো শুধু একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী। (শুয়ারা: ১১৫)।

তিনি ধনী গরিব, সম্মানিত নিন্মশ্রেণী, ছোট বড়, সাদা কালো কোনো ভেদাভেদ না করে সব মানুষকে সতর্ক করলেন... তার জাতি যখন তার আনিত সব দলিল প্রত্যাখ্যান করল, তারা জবাব দিতে ব্যর্থ হয়ে তাকে পাথর মেরে হত্যা করার হুমকি দিল। তারা বলল, হে নূহ! যদি তুমি বিরত না হও, তবে তুমি নিশ্চিতই প্রস্তুরাঘাতে নিহত হবে। (শুয়ারা : ১১৬)।

যখন নুহ (আ.) নিশ্চিত হলেন যে, তার জাতি যুক্তিসংগত দাওয়াত গ্রহণ করেবে না, তারা হেদায়েতের পথে চলবে না, তখন তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের থেকে নিজেকে রক্ষা করতে আল্লাহর কাছে বিনীতভাবে দোয়া করতে লাগলেন। নুহ বললেন, হে আমার পালনকর্তা! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে মিথ্যাবাদী বলছে। (শুয়ারা: ১১৭)। অতএব, আমার ও তাদের মধ্যে কোনো ফয়সালা করে দিন এবং আমাকে ও আমার সঙ্গী মুমিনদেরকে রক্ষা করুন। (শুয়ারা: ১১৮)।

তিনি স্বজাতিকে আল্লাহর আজাবের ভয় দেখালেন, কিন্তু এতে তাদের কুফুরীই বেড়ে চলল। তারা পরস্পর বললে লাগল, এখন আপনার সেই আজাব নিয়ে আসুন, যে সম্পর্কে আপনি আমাদিগকে সতর্ক করেছেন, যদি আপনি সত্যবাদী হয়ে থাকেন। (হুদ : ৩২)।

নুহ (আ.) তাদেরকে বললেন, আজাবের ব্যাপারটা আমার হাতে নয়। তিনি বলেন, উহা তোমাদের কাছে আল্লাহই আনবেন, যদি তিনি ইচ্ছা করেন। (হুদ : ৩৩)। আর আমি তোমাদের নসীহত করতে চাইলেও তা তোমাদের জন্য ফলপ্রসূ হবে না। (হুদ : ৩৪)।

তখন আল্লাহ তায়ালা ওহি নাজিল করেন, যারা ইতোমধ্যেই ঈমান এনেছে তাদের ছাড়া আপনার জাতির অন্য কেউ ঈমান আনবে না। এতএব, তাদের কার্যকলাপে বিমর্ষ হবেন না। (হুদ : ৩৬)।

ধর্ম বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর