ব্রেকিং:
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে টিকা নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
  • শুক্রবার   ০৫ মার্চ ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ২১ ১৪২৭

  • || ২১ রজব ১৪৪২

সর্বশেষ:
আরো ৪ কোটি ডোজ টিকা কেনার চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ পঞ্চম ধাপে ভাসানচরে পৌঁছেছেন আরো ১ হাজার ৭৫৯ রোহিঙ্গা সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প: গাইবান্ধায় ঠিকানা পেল ৫০ সাঁওতাল পরিবার মার্কিন গণমাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নতির ভূয়সী প্রশংসা আত্মরক্ষায় মার্শাল আর্ট শিখছে তেঁতুলিয়ার কিশোরীরা

ফলন বাড়ছে ফসলের

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ১৬ জানুয়ারি ২০২১  

দেশে প্রথমবারের মতো অতিমাত্রায় কার্যকর একটি মিশ্র তরল সার উদ্ভাবন করা হয়েছে। এই সার ব্যবহারের মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধির পাশাপাশি ফসল ভেদে ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমপক্ষে ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে এ সার প্রয়োগে দেখা গেছে, বোরো ধানের চারা কোল্ড ইনজুরির হাত থেকে রক্ষা করা, শীতকালে পানের পাতা ঝরে পড়া রোধ, মধ্যম মাত্রার লবণাক্ত এলাকায় ধানসহ বিভিন্ন ফসল ভালভাবে চাষ করা যায় এই সার প্রয়োগের মাধ্যমে। গম বীজ বপনের আগে এই মিশ্র সার বীজে প্রয়োগ ও পাতায় স্পে করলে ফসলের ফলন ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন সবজি ফসলে অতিরিক্ত পরিপূরক হিসেবে ব্যবহারে ২০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বাড়ে। বিশেষ করে, কুমড়া জাতীয় পরিবারের ফসল যেমন- লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, শসা, তরমুজ, করলা ঝিঙ্গা প্রভৃতি ফসলের ফলন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

পাতার মাধ্যমে অতিরিক্ত পরিপূরক হিসেবে পুষ্টি প্রদান করে ধান ও গমের ক্ষেত্রে ১০-১৫ শতাংশ এবং সবজির ক্ষেত্রে ২০-৫০ শতাংশের মধ্যে ফসলের ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব। শীত মৌসুমে বোরো ধানের চারার কোল্ড ইনজুরি অনেকাংশে রোধ করা যায়, তীব্র শীতের সময় পানের পাতা ঝরা রোগ ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়া সম্ভব হয়, অম্লীয় বা লবণাক্ত এলাকার মাটিতে সহজেই অধিক ফসল ফলানো যায়। এছাড়া গম বীজ ফাটিলাইজেশন বা প্রাইমিং করে ও পাতার মাধ্যমে এই তরল সার প্রদান করে গমের ফলন ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়। বীজ ফার্টিলাইজেশন এবং পাতার মাধ্যমে পুষ্টি প্রদান কৌশল যুগপৎভাবে প্রয়োগ করে মাঠ পর্যায়ে গম এবং বিভিন্ন ডাল জাতীয় ফসলের ফলন ১০-২০ শতাংশের মধ্যে বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে। এ ধারণাটি প্রয়োগ করে প্রায় ৩০ বছর আগে থেকেই অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডাতে গম চাষ করা হচ্ছে। এভাবে তারা গড়ে ১২.৫ শতাংশ গমের ফলন বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানা গেছে।

এই সার ব্যবহারের মাধ্যমে কম ইউরিয়া প্রয়োগ করে বেশি ধান উৎপাদনের বিষয়টি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিএডিসির বিভিন্ন খামারের পরীক্ষাতে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে, যা ইতোমধ্যে বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া অরকিড এবং ছাদ বাগানের বিভিন্ন ফসলের বৃদ্ধি এবং ফুল ও ফল ধারণে উদ্ভাবিত এই মিশ্র তরল সারাদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অরকিডের ক্ষেত্রে এই তরল সার বিদেশী তরল সারের চাইতেও বেশি ভাল কাজ করছে বলে ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) বিভিন্ন খামার এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) বিভিন্ন অঞ্চলে ধান ও সবজি চাষে এই মিশ্র সার প্রয়োগে আশানুরূপ ভাল ফল পাওয়া গেছে। এসব খামার ও অঞ্চলে ধান ও সবজি চাষে এই সার প্রয়োগে যেমন উল্লেখযোগ্য পরিমান ইউরিয়া সাশ্রয় হয়েছে, তেমনি আশানুরূপ ফলনও বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাট ফসলের ওপর এই সার অতিরিক্ত পরিপূরক হিসেবে প্রতি লিটার পানিতে ৭ মিলিগ্রাম হারে ফসলটি বপনের ৩০ দিন, ৪৫ দিন ও ৬০ দিনের সময় স্প্রে করার কারণে পাটের আঁশের ফলন ২৪.৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এক হেক্টর জমিতে একবার স্প্রে করতে ৫০০ লিটার দ্রবণ ব্যবহার করা হয়েছে। পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছ, উদ্ভাবিত তরল সার একটি কার্যকর মিশ্র সার এবং অতিরিক্ত পরিপূরক হিসেবে ব্যবহারে পাটের আঁশের ফলন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহী অঞ্চলে রবি মৌসুমে ধান ও পটলের ওপর এই মিশ্র সার প্রয়োগ করে দেখেছে, ব্রি ধান ২৮ ও ব্রি ধান ২৯ এর ফলন হেক্টর প্রতি দশমিক ১৫০ টন থেকে দশমিক ৩০০ টন পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আর পটোলের ফলন বেড়েছে হেক্টরপ্রতি দশমিক ১৩৮ টন।

এ প্রসঙ্গে পাবনার টেবুনিয়া খামারের উপপরিচালক মহিবুর রহমান বলেন, এই তরল সারটি আমরা গম ও আলুতে প্রয়োগ করেছি। উভয় ফসলেই আমরা ভাল ফল পেয়েছি। উৎপাদন যেমন বেড়েছে, অন্যান্য সারও কম লেগেছে।

তিনি বলেন, গাছ শিকড় দিয়েও খাদ্য গ্রহণ করে, আবার পাতা দিয়েও খাদ্য গ্রহণ করে। এই তরল সার পাতায় স্প্রে করে প্রয়োগ করতে হয়। যা গাছের পাতা সহজেই গ্রহণ করতে পারে। এতে গাছ দ্রুত পুষ্ট হয়ে উঠে এবং ভাল ফলন দেন। এই তরল সার সবচেয়ে কাজে দেয়, গাছ যখন কোন কারণে শিকড়ের মাধ্যমে মাটি থেকে পুষ্টি গ্রহণে অসুবিধার সম্মুখীন হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের রংপুর অঞ্চলের ৭ জেলায় মিশ্র তরল সার ব্যবহারের ফলে ধানের (ব্রি-২৮, ব্রি-২৯, ব্রি-৪৯, বিআর-১১, বিনা-৭ ও স্বর্ণা) ক্ষেত্রে ইউরিয়া সাশ্রয় হয়েছে প্রতি হেক্টরে দশমিক ৭ টন এবং ফলন বেড়েছে হেক্টরপ্রতি দশমিক ২৭ টন। অন্যদিকে সবজির ক্ষেত্রে ইউরিয়া সাশ্রয় হয়েছে ৩৭.৫০ শতাংশ এবং ফলন বেড়েছে শিম ৫০ শতাংশ, লাউ ৫০ শতাংশ ও বেগুন ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ ধান ও সবজি চাষে ইউরিয়ার অপচয় রোধ ও ফলন বৃদ্ধিতে এই মিশ্র তরল সার একটি সময়োপযোগী প্রযুক্তি বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে নীলফামারীর ভিত্তি আলু বীজ উৎপাদন খামারের উপপরিচালক এনামুল হক বলেন, এই তরল সার আমরা খামারে প্রয়োগ করে ভাল ফল পেয়েছি। এতে সারও যেমন কম লাগে, ফলনও বেশি হয়। এ কারণেই পশ্চিমা দেশগুলোতে এখন এই সার বেশি ব্যবহার হচ্ছে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কেউ যদি তৈরি খাবার পায় তাহলে সে সেই খাবার আগে গ্রহণ করেন। আমরা মাটিতে যে সার প্রয়োগ করি, সেই সার মাটির সঙ্গে মিশে তারপর সেখান থেকে শিকড়ের মাধ্যমে গাছ খাদ্য গ্রহণ করে। আর তরল সার পাতাতে প্রয়োগ করা হয়। আর এটি একেবারে গাছের তৈরি খাবার, যা গাছ সহজে পায়। ফলে এই খাবারটি গাছ আগে এবং দ্রুত গ্রহণ করে। এ কারণে তরল সার ব্যবহার করলে অন্যান্য সার কম লাগে এবং ফলন বেশি হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিআর ২৬ ও ব্রি ধান ২৮ এর ওপর এই মিশ্র সার প্রয়োগে দেখা গেছে, হেক্টরপ্রতি ইউরিয়া সাশ্রয় হয়েছে দশমিক ১২ টন এবং ফলন বেড়েছে দশমিক ৪ টন। একই অবস্থা ডিএইর রাজশাহী অঞ্চলেও। বিভিন্ন প্রকার ধান আবাদে এই মিশ্র সার প্রয়োগের ফলে হেক্টর প্রতি ইউরিয়া সাশ্রয় হয়েছে ৬৩ কেজি এবং ফলন বেড়েছে ২৮ কেজি।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট রংপুর কেন্দ্রের পরীক্ষায় পাটের আঁশের ফলন শতকরা প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া চা গাছের বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারছে বলে বাংলাদেশ টি বোর্ডের বান্দরবান এবং পঞ্চগড় কেন্দ্রের পরীক্ষাতে প্রমাণিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোঃ আবদুর রহিম বলেন, আমার ছাত্ররা এই তরল সারটি নিয়ে কাজ করেছে। তারা বিভিন্ন ফসলে প্রয়োগ করে ভাল ফল পেয়েছে। তাই আমাদের দেশের কৃষির স্বার্থে এই সারকে উৎসাহিত করা উচিত।

তিনি বলেন, এই সার গাছের জন্য খুবই উপকারী। এটা ব্যবহারে সারের অপচয় কম হয়, ফলন বাড়ে। অথচ সরকার কেন এই সার আমদানি ও ব্যবহার বন্ধ করে রেখেছে জানি না। অথচ পৃথিবীর বহু দেশেই এই সার ব্যবহার করছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ড ভিয়েতনামের মতো যে সকল দেশে কৃষির আবাদ বেশি, সেসব দেশেই তরল সার ব্যবহার করছে। অপচয় ও ফসলের উৎপাদন বাড়াতে আমাদের দেশেও অবশ্যই এই সার ব্যবহারের অনুমতি দেয়া উচিত।

ম্যাজিক গ্রোথ ব্যবহার করে বিএডিসির অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক খিলগাঁওয়ের খোরশেদ আলম তার ছাদের টমেটো গাছের উপরে প্রয়োগ করে খুব ভাল ফলাফল পেয়েছেন বলে জানান। তার গাছের বৃদ্ধি যেমন বেশি ভাল হয়েছে তেমনি ফল ধরেছে বেশি এবং ফলের আকারও বেশি বড় হয়েছে। অরকিডের ওপরে ব্যবহার করে ভাল ফল পেয়েছেন ঢাকার বুয়েট ক্যাম্পাসের তানিয়া সুলতানা। সিলেট অরকিড সোসাইটির সভাপতি শিরিন আকতার জানান, তিনি মূলত বিদেশী তরল সার তার অরকিডে ব্যবহার করেন তবে দেশী এই তরল সারের কার্যকারিতা বিদেশী মিশ্র তরল সারের চাইতে ভাল প্রমাণ পেয়েছেন। এছাড়াও ছাদ বাগানের বিভিন্ন ফসলে ব্যবহার করে যারা সুফল পেয়েছেন তার হলেন, নারায়ণগঞ্জের ইকবাল, যাত্রাবাড়ীর ফতেমা পারভেজ, মিরপুরের এজাজ শুভ। এছাড়া রাষ্ট্রের অনেক উঁচু পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তিবর্গও মিশ্র তরল সার ব্যবহার করে এর সুফল পেয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা তার উপজেলার ছাদ বাগানের বিভিন্ন ফসলে ব্যবহার করে ভাল ফল পেয়েছেন। চট্টগ্রামের কলি নাহার এবং তারেক ইফতেখার এই তরল সার ব্যবহারে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই গাছের বৃদ্ধি ভাল হয়েছে গাছের স্বাস্থ্য বেশি ভাল হয়েছে এবং ফুল-ফল বেশি হয়েছে। এ সময়ে আরবান এলাকার ব্যাপকসংখ্যক মানুষ উদ্ভাবিত মিশ্র তরল সার ব্যবহারের প্রতি আগ্রহী হয়েছেন।

ছাদ বাগানের ক্ষেত্রে অধিক ভাল ফল পাবার মূল কারণ হলো। টবের অল্প মাটিতে পুষ্টি থাকে কম। এজন্য নির্দিষ্ট বিরতিতে পাতার মাধ্যমে পুষ্টি প্রদান করলে গাছ সঠিকভাবে বিভিন্ন অত্যাবশ্যকীয় ম্যাক্রো এবং মাইক্রো পুষ্টির জোগান পায়। ফলে ভাল ফল দিয়ে থাকে। অরকিডের বৃদ্ধি এবং ফুল দেবার কারণও এই তরল সারের মধ্যস্থিত পুষ্টি উপাদান। অধিকাংশ অরকিড গ্রোয়াররা অরকিডে শুধু পানি দেয় এজন্য একটা সময় পরে পুষ্টি ঘাটতিতে পড়ে অরকিড মারা যায় বা ফুল না দিয়ে কোনমতে বেঁচে থাকে। দেশের ছাদ বাগান সম্প্রসারণে এই তরল সার গাছে সুষম পুষ্টির জোগান দিয়ে উল্লেখযোগ্য সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

ফলিয়ার ফিডিং প্রযুক্তি কী ॥ পাতার মাধ্যমে গাছের খাদ্য গ্রহণকে ফলিয়ার ফিডিং প্রযুক্তি বলা হয়। আমরা মুখ দিয়েই আমাদের খাদ্য গ্রহণ করে থাকি কিন্তু কখনও যদি বেশি মাত্রায় অসুস্থ হয়ে যাই, তবে আমাদেরকে ভেইনের মাধ্যমে পুষ্টি প্রদান করে (স্যালাইনের মাধ্যমে) সুস্থ করা হয়। গাছ সাধারণভাবে শিকড়ের মাধ্যমে তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে। কিন্তু যদি কোন কারণে শিকড়ের মাধ্যমে পুষ্টি উত্তোলনে অসুবিধার সম্মুখীন হয় (সাময়িক খরা, জলাবদ্ধতা, পিএইচজনিত সমস্যা, নিম্ন তাপমাত্রা ইত্যাদি) তবে গাছকে পাতার মাধ্যমে পুুষ্টি দিয়ে বেশ ভালভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়। গাছকে পাতার মাধ্যমে খাদ্য বা পুষ্টি প্রদানের এই বিষয়টিকেই ফলিয়ার ফিডিং বা ফলিয়ার ফার্টিলাইজেশন বা ফলিয়ার ফার্টিগেশন বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে শুধু পাতা নয় মাটির উপরের যে কোন অংশ দিয়েই গাছ পুষ্টি উপাদানসমূহ গ্রহণ করতে পারে।

যতদূর জানা যায়, ফসল উৎপাদনের এই প্রযুক্তির প্রথম প্রয়োগ হয় ১৮৪৪ সালে আমেরিকাতে। তবে এটা যে বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য পদ্ধতি তা প্রমাণ হয় ১৯৫০ সালে। আমেরিকার মিসিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের বিজ্ঞানী ড. এইচ বি টুকে এবং এস এইচ উইটার বিষয়টি সর্বপ্রথম সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করেন যে ফসলে পুষ্টি প্রদানের ক্ষেত্রে এই ফলিয়ার ফিডিং একটি অতিমাত্রায় কার্যকর পদ্ধতি।

এখন প্রশ্ন হতে পারে পাতার মাধ্যমে পুষ্টি প্রদান করলে কেন ফসলের ফলন বৃদ্ধি পাবে? উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদের সময় আজকাল আর জমিতে সেভাবে জৈব পদার্থ প্রদান করা হয় না। এজন্য মাটিতে অনুখাদ্যের ব্যাপকভাবে ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। আবার যে সকল অনুখাদ্য ব্যবহার করা হয় তার অধিকাংশই ভেজালে ভরা, যা এসআরডিআইর রিপোর্ট থেকে জানা যায়। এসকল অনুখাদ্য খুব কম পরিমাণে প্রয়োজন হলেও এগুলোর গুরুত্ব ফসল উৎপাদনে খুবই বেশি। যেমন- কোন জমিতে দস্তার ঘাটতি থাকলে সে জমিতে ধান গাছ প্রতিষ্ঠিত করা যায়না, বোরণের ঘাটতি থাকলে গম এবং ভুট্টার পরাগায়নে সমস্যা হয়। বিভিন্ন ফল জাতীয় সবজির ফলন অনেক কমে যায়।

অম্লধর্মী মাটিতে ফসফরাস মৌলটি আয়রন এবং এলুমিনিয়ামের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ফসফেটের কমপ্লেক্স তৈরি করে বলে গাছ সঠিকভাবে ফসফেট পায় না। ফলে গাছে ফুল ফল কমে যায়। কীটনাশকের অধিক ব্যবহার এবং জৈব সার ব্যবহার না করে কেবল রাসায়নিক সারের ব্যবহারের মাধ্যমে ফসল চাষ করতে গিয়ে জমিতে উপকারী অণুজীব এবং কেঁচো আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। অণুজীবের অভাবে ব্যবহৃত ইউরিয়া পূর্ণমাত্রায় গাছের জন্য গ্রহণোপযোগী হতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জলাবদ্ধ বা সাময়িক ক্ষরার সময় ধানের জমিতে সময়মতো নাইট্রোজেন না দিতে পারলে ফলন অনেক কমে যায়। আবার লবণাক্ত মাটিতে ইউরিয়েজ এনজাইমের কার্যকারিতা কম থাকার কারণে প্রয়োগকৃত ইউরিয়া হাইড্রোলাইসি হয়ে এমোনিয়াম আয়ন তৈরি করতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়। এছাড়া ফসফেট এবং পটাশ কম গ্রহণ করতে পারে। আবার কপার, আয়রন, জিঙ্ক এবং ম্যাঙ্গানিজ অণুপুষ্টি উপাদানগুলোও গাছ সহজে গ্রহণ করতে পারে না বলে ভাল ফলন পাওয়া যায় না।

পাতার মাধ্যমে খাদ্য প্রদান সংক্রান্ত ফলিয়ার ফিডিং কৌশলের সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে এ ধরনের সমস্যা অনেকাংশে সমাধান করা যায় এবং অধিক ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়। এই প্রযুক্তি ব্যবহারে উন্নত বিশ্বে ইলেকট্রোস্ট্যাটিক বুম স্প্রেয়ার, বিমান, হেলিকপ্টার এমন কি ড্রোন পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের দেশে বর্তমানে যে সকল আমদানিকৃত বিদেশী ফল পাওয়া যায়, তার ১০০ ভাগই পাতার মাধ্যমে পুষ্টি প্রদান কৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয়ে থাকে।

ধানের ফলন বৃদ্ধিতে ফলিয়ার ফিডিং প্রযুক্তি ॥ বর্তমান সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধানের জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। কিন্তু নতুন নতুন জাতগুলো সেভাবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চাষী পর্যায়ে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না। যেমন ২০২০-২১ বোরো মৌসুমে বিএডিসি থেকে জনপ্রিয় উচ্চফলনশীল জাত ব্রি ধান২৮ এবং ব্রি ধান২৯ এর বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ৫১০০০ মেঃ টন। কিন্তু এই দুটি জাতের ধানের চাইতে অধিক ফলনশীল, ব্রি ধান২৮ এর বিকল্প জাত ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান ৮৪, ব্রি ধান, ব্রিধান ৮৬, ব্রি ধান ৮৮ এবং ব্রি ধান ৯৬ এবং ব্রি ধান ২৯ এর বিকল্প ব্রি ধান৮৯ এবং ব্রি ধান৯২ এর বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ১০১৪ টন। এর সঙ্গে হয়তো সরাসরি ব্রি থেকে এবং ডিএইর মাধ্যমে চাষী পর্যায়ে বীজ উৎপাদন সংরক্ষণ এবং বিতরণ প্রকল্পের কিছু বীজ থাকতে পারে। ফলে জাতের পাশাপাশি ধান উৎপাদনের নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ধানের উৎপাদনশীলতা যদি বৃদ্ধি করা যায় তবে তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত। গবেষণায় আজ প্রমাণিত যে, পাতার মাধ্যমে পুষ্টি প্রদান করে ১০-১৫ শতাংশের মধ্যে ধানের ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব। পৃথিবীর অনেক ধান উৎপাদনকারী দেশ ফলিয়ার ফিডিং কৌশলের সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে ধানের ফলন বৃদ্ধি করছে। ব্রি’র এগ্রোনমি বিভাগের দীর্ঘ তিন বছরের গবেষণাতে প্রমাণিত হয়েছে যে, পাতার মাধ্যমে পুষ্টি প্রদান কার্যকর বিকল্প পদ্ধতি। বর্তমান সময়ে ব্যাকটেরিয়াল লিফ ব্লাইট রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্দিষ্ট ঘনত্বে পটাশিয়াম (০.৬ শতাংশ ঘনত্বে) এবং সালফার (০.৬ শতাংশ ঘনত্বে) মৌলকে একত্রে স্প্রে করে পাতার মাধ্যমে প্রদানের জন্য ব্রি থেকেও সুপারিশ করা হচ্ছে, যা রোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মিশ্র তরল সারের কার্যকারিতার বিষয়টিকেই প্রমাণ করে।

গত ২০১৯-২০ রোরো মৌসুমে কেজিএফের নির্দেশনাতে শের-এ-বাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. অলক কুমার পালের সরাসরি সম্পৃক্ততায় গবেষণাতেও প্রমাণিত হয়েছে যে, পাতার মাধ্যমে পুষ্টি প্রদানের কৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে মাটিতে ৩০ শতাংশ এবং সামগ্রিকভাবে ১৫ শতাংশ ইউরিয়া সাশ্রয় করেও প্রায় ১১ শতাংশ (হেক্টরে ৬৪৬ কেজি) ধানের ফলন বৃদ্ধি সম্ভব। এ গবেষণাতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিভাগের সিনিয়র প্রফেসর এবং বিএডিসির টেবুনিয়া বীজ উৎপাদন খামারের উপপরিচালক (খামার) সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়া বিএডিসির গবেষণা সেলের আওতায় টেবুনিয়া বীজ উৎপাদন খামারের গবেষণাতেও প্রায় একই ধরনের ফলাফল পাওয়া গেছে। এছাড়া ২০১২-১৩ সালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ডিএইর শত শত প্রদর্শনীর পরীক্ষাতে বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। ফলে আমাদের দেশের কৃষিতে ধান চাষে অতিরিক্ত পরিপূরক খাদ্য হিসেবে যদি মিশ্র তরল সার প্রয়োগের বিষয়ে সুপারিশ করা হয়, তাহলে এখনই সকল জাতের ধানের ফলন ১০-১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এতে মাঠ পর্যায়ে ধানের ফলন পার্থক্য (ইল্ড গ্যাপ) কমে আসবে।

উদ্ভাবিত তরল সারে কি উপাদান আছে ॥ উদ্ভাবিত মিশ্র তরল সারের মধ্যে রয়েছে উদ্ভিদের ১৩টি অত্যাবশ্যকীয় খনিজ পুষ্টি উপাদান ছাড়াও কিছু বেনিফিসিয়ারি উপাদান, যা গাছের পুষ্টির ঘাটতি তাৎক্ষণিক মিটাতে সাহায্য করে। সারটিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে যে সকল পুষ্টি উপাদান রয়েছে তা হলো, নাইট্রোজেন-১০.৫১ শতাংশ, পটাশ ৭.৬২ শতাংশ, ফসফেট ১২.৬৬ শতাংশ, সালফার ০.১ শতাংশ, বোরণ ০.২৫ শতাংশ এবং দস্তা ০.১৬ শতাংশ রয়েছে। মূলত ২০০৬ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শত শত চাষী, কৃষিবিদ, কৃষি বিজ্ঞানী এবং সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে এই সারের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। প্রতিটি পরীক্ষাতেই এর কার্যকারিতা সম্বন্ধে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। অথচ মিশ্র তরল সার ব্যবহার বিষয়ে খসড়া নীতিমালা এবং সার ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৬ সংক্রান্ত কিছু জটিলতা থাকার কারণে দেশে উদ্ভাবিত এই মিশ্র তরল সারের স্বীকৃতি এবং কৃষির কল্যাণে কাজে লাগার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী দফতরের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট থেকে তার এই উদ্ভাবনের বিষয়টিকে জাতীয় অতিগুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট পর্যায়কে পত্র প্রদান করা হয়েছে এবং কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে নিজস্ব গবেষণার অংশ হিসেবে কর্মপরিকল্পনাভুক্ত করে ফলাফল উপস্থাপনের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে পত্র প্রদান করা হয়েছে।

এই মিশ্র তরল সারের উদ্ভাবক বিএডিসির বর্তমান অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (বীজ বিতরণ) কৃষিবিদ মোঃ আরিফ হোসেন খান। তিনি তার উদ্ভাবিত এই মিশ্র তরল সারের নাম দিয়েছেন ম্যাজিক গ্রোথ। অবশ্য এই উদ্ভাবনীটি তিনি করেছেন বিএডিসির রাজশাহী অঞ্চলে সার ব্যবস্থাপনা বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে দীর্ঘ ১৬ বছরের গবেষণার মাধ্যমে। তিনি বলেন, মাটি, পানি এবং পরিবেশ সুরক্ষাসহ টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে (এসডিজি-২) এগিয়ে নিতে দেশে মিশ্র তরল সারের ব্যবহার বিষয়ে যুগোপযোগী যথাযথ নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। কেননা পার্শ্ববতী দেশ ভারতসহ উন্নত বিশ্বে ফসল উৎপাদনে তারা ব্যাপকভাবে মিশ্র তরল সারের ব্যবহার করে থাকেন। মরু এলাকার ফসল চাষে মিশ্র তরল সারের ব্যবহার বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন ফসলের রেকর্ড ব্রেকিং ফলন ফলাতে মিশ্র তরল সারের সাহায্য নেয়া হয়। মিশ্র তরল সারের সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের দেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনেক ক্ষতির হাত থেকে চাষীরা তাদের ফসল রক্ষা করতে পারবে। তিনি বলেন, মাটির লবণাক্ততা, অম্লত্ব বা ক্ষারত্বজনিত সমস্যায় মিশ্র তরল সারের ব্যবহার চাষীদের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনবে। অধিক ফলন পাবার কারণে চাষীদের উৎপাদন ব্যয় কমে যাবে। ১০-১৫ শতাংশ রাসায়নিক সারের ব্যবহার হ্রাসের মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ অধিক সুরক্ষিত থাকবে।

বর্তমান সময়ে দেশে তরল সার ব্যবহার বিষয়ে সার ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৬ ও খসড়া নীতিমালাগত জটিলতা থাকার কারণে যুগান্তকারী এই উদ্ভাবনটি দেশের কৃষির কল্যাণে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না বলে উদ্ভাবক জানান কৃষিবিদ আরিফ হোসেন খান। করোনা মহাদুর্যোগের সময়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধির স্বার্থে এ বিষয়ে তিনি কৃষিমন্ত্রী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।