রোববার   ১৭ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৩ ১৪২৬   ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

১৪

যে ভুলগুলো হলে সিজদায়ে সাহু করবেন

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর ২০১৯  

প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত (নির্দিষ্ট নামাজের নির্দিষ্ট সময়) নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক বা ফরজ। নামাজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি।

ঈমান বা বিশ্বাসের পর নামাজই ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

নামাজে পরিপূর্ণ মনোযোগী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবু আমরা মানুষ, আমাদের ভুল হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ বান্দার আমল নষ্ট হতে দেন না। তাই নামাজে একান্তই কোনো ফরজ রোকন ছেড়ে না দিলে, ওয়াজিব ছেড়ে দিলেও সিজদায়ে সাহুর মাধ্যমে নামাজকে শুদ্ধ করে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। 

কোন কোন ভুলে সিজদায়ে সাহু করতে হবে, তা নিম্নে আলোচনা করা হলো-

(১) নামাজে কোনো ওয়াজিব ছুটে গেলে সিজদায়ে সাহু আদায় করতে হবে। অন্যথায় নামাজ হবে না। ভুলক্রমে বা ইচ্ছাকৃতভাবে সিজদায়ে সাহু আদায় না করলে নামাজ পুনরায় পড়তে হবে।

সিজদায়ে সাহু বা সাহু সিজদা দেয়ার নিয়ম হলো- শেষ রাকাতে আত্তাহিয়্যাতু পড়ে শুধু ডান দিকে সালাম ফিরিয়ে ২টি সিজদা দিতে হবে। দুই সিজদার মাঝখানে অবশ্যই ১ তাসবিহ পরিমাণ সোজা হয়ে বসতে হবে। তারপর যথারীতি আবার আত্তাহিয়্যাতু, দুরুদ শরীফ ও দোয়ায়ে মাসূরা পড়ে নামাজ শেষ করতে হবে।

তবে নামাজে যদি কোনো ফরজ ছুটে যায় তাহলে সিজদায়ে সাহু কার্যকর হবে না। নামাজ পুনরায় আদায় করতে হবে। আবার অনেককে দেখা যায় কোনো কারণ ছাড়াই সব নামাজের শেষে একটা সাহু সিজদা দিয়ে দেয়। এমনটি করাও সঠিক নয়।

(২) আপনি যদি জামাতে নামাজ পড়েন তাহলে ইমাম সাহেব যদি সাহু সিজদা দেয় তাহলে আপনি দেবেন। আর যদি আপনি জামাতে মাসবুক তথা ইমাম সাহেব এক বা একাধিক রাকাত পড়ে ফেলার পর জামাতে এসে যুক্ত হন এবং তখন আপনার নিজের পড়া রাকাতে কোনো ওয়াজিব ছুটে যায় তাহলে আপনাকে সিজদায়ে সাহু করতে হবে।

(৩) মনে রাখতে হবে যে-
(ক) ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে সূরা ফাতেহা পড়া ওয়াজিব। যদি আপনি ফরজ নামাজের ১ম রাকাত বা ২য় রাকাত বা উভয় রাকাতেই সূরা ফাতেহা ভুল করে না পড়েন, তাহলে আপনাকে সিজদায়ে সাহু আদায় করতে হবে। আবার ফরজ নামাজের ৩য়/৪র্থ রাকাতে সূরা ফাতেহা পড়া সুন্নাত। আপনি যদি যে কোনো ফরজ নামাজের ৩য়/৪র্থ রাকাতে সূরা ফাতেহা ভুল করে না পড়েন, তবে সিজদায়ে সাহু দিতে হবে না।

(খ) ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে সূরা ফাতেহা পড়ার পর অন্য একটি সূরা মিলানো ওয়াজিব। যদি আপনি ভুল করে ফরজ নামাজের প্রথম ২ রাকাতে সূরা ফাতেহা পড়ার পর অন্য কোনো সূরা না পড়েন, তাহলে আপনাকে সিজদায়ে সাহু করতে হবে। আবার ফরজ নামাজের ৩য়/৪র্থ রাকাতে সূরা ফাতেহা পড়ার পর অন্য কোনো সূরা পড়ার বিধান নেই। তবে আপনি ভুলে ফরজ নামাজের ৩য়/৪র্থ রাকাতে সূরা ফাতেহা পড়ার পর অন্য কোনো সূরা পড়ে ফেললে সিজদায়ে সাহু করতে হবে না।

(গ) সুন্নাত ও নফল নামাজের প্রত্যেক রাকাতেই সূরা ফাতেহা পড়ার পর অন্য একটি সূরা মেলানো ওয়াজিব। আপনি যদি যে কোনো সুন্নাত/নফল নামাজের যে কোনো রাকাতে সূরা ফাতেহা বা সূরা ফাতেহার পর অন্য একটি সূরা না পড়েন তাহলে আপনি একটি ওয়াজিব ছেড়ে দিলেন। আপনাকে অবশ্যই সিজদায়ে সাহু করতে হবে।

(ঘ) ভুল করে যে কোনো রাকাতে ২ রুকু বা ৩ সিজদা দিলে সিজদায়ে সাহু করতে হবে।

(ঙ) সূরা ফাতেহা পড়ার পর এখন কী সূরা পড়বো- এ চিন্তায় যদি ৩ তসবীহ পরিমাণ সময় চলে যায় তাহলে সিজদায়ে সাহু করতে হবে। অথবা কোনো সূরার কোনো আয়াত ভুলে গেছেন ওই আয়াত স্মরণ করার জন্য যদি ৩ তাসবীহ পরিমাণ সময় চলে যায় তাহলে সিজদায়ে সাহু করতে হবে। ফরজ ও সুন্নত নামাজের ১ম বৈঠকে যদি ভুলে দুইবার আত্তাহিয়্যাতু পড়ে ফেলেন তাহলে সিজদায়ে সাহু করতে হবে। আবার ফরজ ও সুন্নত নামাজের ১ম বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু পড়ার পর যদি দরুদ শরিফের ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ’ পর্যন্ত পড়ে ফেলেন তাহলে শেষ বৈঠকে সিজদায়ে সাহু করতে হবে। অবশ্য তারচেয়ে কম পড়লে সিজদায়ে সাহু করতে হবে না। তবে নফল নামাজের যে কোনো বৈঠকে দুইবার আত্তাহিয়্যাতু পড়ে ফেললে সিজদায়ে সাহু দিতে হবে না।

(চ) যে কোনো বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু পড়ার সময় যদি ভুলে সূরা ফাতেহা পড়ে ফেলেন তাহলে সিজদায়ে সাহু করতে হবে। তবে নিয়ত করার সময় সানার পরিবর্তে ভুলে দোয়ায়ে কুনুত পড়ে ফেললে সিজদায়ে সাহু করতে হবে না।

(ছ) ৩/৪ রাকাত বিশিষ্ট নামাজে প্রথম বৈঠক ভুলে গেছেন এবং ৩য় রাকাতের জন্য দাঁড়িয়ে গেছেন, যদি অর্ধেকের কম দাঁড়িয়ে থাকেন তাহলে বসে পড়বেন এবং আত্তাহিয়্যাতু পড়ে ৩য় রাকাতের জন্য দাঁড়াবেন। এ অবস্থায় সিজদায়ে সাহু করতে হবে না।

আর যদি অর্ধেকের বেশি দাঁড়িয়ে যান তাহলে আর বসবেন না। ৩/৪ রাকাত নামাজ শেষ করে শেষ বৈঠকে সিজদায়ে সাহু দেবেন।

(জ) যোহর ও এশার ৪র্থ রাকাতে বসতে মনে নেই। একেবারে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ৫ম রাকাতের জন্য দাঁড়িয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে মনে হবার সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়তে হবে। আত্তাহিয়্যাতু ও দুরুদ শরীফ পড়ে সালাম ফেরাবেন। এক্ষেত্রে সিজদায়ে সাহু করতে হবে না।

আর যদি ৫ম রাকাতে সূরা ফাতেহা পড়ে ফেলেন এবং রুকুও করে ফেলেন তবুও বসে পড়বেন। এ অবস্থায় সিজদায়ে সাহু করতে হবে। আর যদি রুকু করার পরও মনে না হয় তাহলে আরো দুই রাকাত পড়ে মোট ছয় রাকাত পড়বেন। এক্ষেত্রে শেষ দুই রাকাত নফল ও প্রথম চার রাকাত ফরজ হিসেবে আদায় হলো।

কিন্তু আসরের নামাজে ৪র্থ রাকাতে এ রকম ভুল হলে মোট ৬ রাকাতই পড়বেন, কিন্তু পুরো ৬ রাকাতই নফল হিসেবে গণ্য হবে। কারণ আসর নামাজের পর কোনো নফল নামাজ নেই। এক্ষেত্রে আপনাকে পুনরায় আসরের নামাজ পড়তে হবে।

(ঝ) নামাজ ৩ রাকাত পড়েছেন না ৪ রাকাত পড়েছেন- এ রকম সন্দেহ যদি সব সময় হয়ে থাকে তাহলে এ সন্দেহের কোনো ভিত্তি নেই, একে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। আর যদি হঠাৎ করে এ সন্দেহ হয় তাহলে এ রাকাতকে ৩য় রাকাত ধরে আরেক রাকাত পড়ে নেবেন। আর যদি ৪র্থ রাকাত বলেই মনে প্রবল ধারণা হয় তাহলে আরেক রাকাত পড়ার দরকার নেই। এই অবস্থায় সিজদায়ে সাহু দিতে হবে না।

আবার ১ম রাকাত পড়লেন না ২য় রাকাত পড়লেন এ রকম সন্দেহ যদি সব সময় হয়ে থাকে তাহলে এ সন্দেহেরও কোনো ভিত্তি নেই। আর যদি হঠাৎ করে এ সন্দেহ হয় তাহলে এ রাকাতকে ১ম রাকাত ধরে আত্তাহিয়্যাতু পড়বেন। কারণ এটা ২য় রাকাতও হতে পারে। আবার ২য় রাকাতেও আত্তাহিয়্যাতু পড়বেন। কারণ এটা ২য় রাকাত হতে পারে। আবার ৩য় রাকাতেও আত্তাহিয়্যাতু পড়বেন। কারণ এটা ৪র্থ রাকাত হতে পারে। তারপর ৪র্থ রাকাতে সিজদায়ে সাহু করে সালাম ফেরাবেন।

(ঞ) নামাজে সালাম ফেরানোর পর যদি নামাজ ৩ রাকাত পড়েছেন, না ৪ রাকাত পড়েছেন এ রকম সন্দেহ সব সময় হয়ে থাকে তাহলে এ সন্দেহের কোনো ভিত্তি নেই। আর যদি স্পষ্টভাবে মনে পড়ে যে, নামাজ ৩ রাকাতই পড়েছেন এবং আপনি এখনো কিবলামুখি হয়ে বসে আছেন এবং কারো সঙ্গে কথাও বলেননি তাহলে সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে আরেক রাকাত পড়ে সিজদায়ে সাহু করে সালাম ফেরাবেন। নামাজ হয়ে যাবে। তবে বেশি দেরী হয়ে গেলে বা কারো সঙ্গে কথা বলে ফেললে অথবা এমন কোনো কাজ করে ফেললে– যা কোনো ব্যক্তি দেখলে মনে করবে যে আপনি নামাজে নেই, তাহলে নামাজ পুনরায় পড়তে হবে।

(ট) একই নামাজে সিজদায়ে সাহু করার একাধিক কারণ ঘটলেও একটি সিজদায়ে সাহু করলেই হবে।

(ঠ) বিতর নামাজে দোয়ায়ে কুনুত না পড়েই রুকুতে চলে গেলে বা দোয়ায়ে কুনুতের পরিবর্তে অন্য কিছু পড়ে ফেললে সিজদায়ে সাহু করতে হবে। আর যদি দোয়ায়ে কুনুতের পরিবর্তে অন্য কিছু পড়ে ফেলেন কিন্তু মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার দোয়ায়ে কুনুত পড়েছেন তাহলে সিজদায়ে সাহু করতে হবে না।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে পূর্ণ মনোযোগী হয়ে নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –