বুধবার   ১১ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২৭ ১৪২৬   ১৩ রবিউস সানি ১৪৪১

৯০৫

রঙহীন জীবন যখন বর্ণান্ধতায়

প্রকাশিত: ২৬ নভেম্বর ২০১৮  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

কেউ যদি কোনো রঙ চিনতে না পারে তাহলে তাকে কালার ব্লাইন্ড বলা হয়। তবে জানেন কী? এটি একটি রোগের নাম। কালার ব্লাইন্ড অর্থ বর্ণান্ধতা বা বর্ণের প্রতি যে অন্ধ।পৃথিবীতে নানা রঙ ভেসে বেড়াচ্ছে। বর্ণান্ধ ব্যক্তি নিজেও জানেন না যে তিনি সব রঙ দেখতে পান না।বর্ণান্ধতে আক্রান্তরা নির্দিষ্ট কোনো রঙ দেখতে পান না। বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন তারা সব ধরনের রঙ দেখতে পান, কিন্তু পরিসংখ্যান বলে অন্য কথা! ‌'অ্যানক্রোমা' নামক একটি অপটিক্যাল প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতি ১২ জন পুরুষের ১ জন এবং প্রতি ২০০ নারীর ১ জন বর্ণান্ধতার শিকার। তবে ব্যাপারটি এমন নয় যে বর্ণান্ধরা কোনো রঙই চিনতে পারে না। এরা অনেক রকমের হয়ে থাকে।

 

1.বর্ণান্ধতায় জীবন যখন রঙহীন

কেন এই বর্ণান্ধতা?

মানুষের চোখের রেটিনায় দু’ধরনের আলোকসংবেদী কোষ রয়েছে। এরা হল-রডকোষ এবং কোন কোষ। কোন কোষ থাকার জন্য আমরা বিভিন্ন রঙ চিনতে পারি এবং তাদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি। রডকোষগুলো শুধু দর্শনের অনুভূতি জাগায়, কিন্তু কোনো রঙ দেখতে সাহায্য করে না।কোন কোষ তিন ধরণের। এই ধরনগুলো লাল, সবুজ ও নীল - তিনটি মৌলিক রঙ সনাক্ত করতে পারে। চোখের রেটিনায় এই তিন প্রকারের কোন-এর যেকোনো একটি, দুটি বা সবগুলোর অনুপস্থিতি বা ত্রুটিই হলো বর্ণান্ধতার মূল কারণ।কোনো ব্যক্তির সবগুলো কোনই যদি ত্রুটিযুক্ত হয়, তাহলে তিনি সব রঙ-ই ধূসর দেখবেন। বর্ণান্ধতা এমনই মারাত্মক হয়, কোনো ব্যক্তি লাল রঙের রক্ত দেখলেও তা সনাক্ত করতে পারে না।

 

2.বর্ণান্ধতায় জীবন যখন রঙহীন

এই রোগটি সাধারণত বংশগত।পুরুষের স্পার্ম কিংবা ক্রোমোজমের কারণে বংশগতভাবে মানুষ এই রোগ ধারণ করে। তবে ছেলেদের এটি হওয়ার সম্ভাবনা মেয়েদের থেকে বেশি থাকে। এর কারণ হচ্ছে, ছেলেদের দুইটি ক্রোমোজম হলো XY, অপরদিকে মেয়েদের দুটি ক্রোমোজম XX। সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ হয় বাবা-মা থেকে আসা ক্রোমোজম থেকে। মেয়েরা কালার ব্লাইন্ডের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক পর্যায়ে থাকে। কারন, বাবা যদি কালার ব্লাইন্ড হয় এবং তার বাবার থেকে প্রাপ্ত X ক্রোমোজমে কালার-ব্লাইন্ডের জিনোম থেকেও থাকে, তবে মায়ের থেকে প্রাপ্ত X ক্রোমোজম তা অনেকটাই পুনরুদ্ধার করতে পারে। কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে, বাবার Y ক্রোমোজমের কোনো ড্যামেজ মায়ের X ক্রোমোজম ঠিক করতে পারে না। তাই এক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশি সুরক্ষিত থাকে।শারীরিক কোনো দুর্ঘটনা কিংবা ঔষধের প্রভাব থেকে অনেক সময় স্বাভাবিক মানুষও বর্ণান্ধ হতে পারে। এক্ষেত্রে চোখের রেটিনায় থাকা রঙ নির্ধারক কোষগুলো মস্তিষ্কে ঠিকমত তথ্য প্রেরণ করতে পারে না। অনেক সময় মাথায় আঘাত পেয়ে কেউ কেউ সাময়িক সময়ের জন্য এমন সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।

বর্ণান্ধতার রকমফের

 

3.বর্ণান্ধতায় জীবন যখন রঙহীন

বর্ণান্ধতা সাধারণত ৩ ধরনের হয়ে থাকে-

১. লাল সবুজ বর্ণান্ধতা: বর্ণান্ধতায় এটা সবচেয়ে প্রচলিত। যা প্রধানত লাল ও সবুজ কোণ ফটো-পিগমেন্টের যথাযথ কার্যকলাপের অভাব থেকে হয়। এই রকমের বর্ণান্ধতাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়-প্রোটানোমালি (লাল কোন পিগমেন্টের অস্বাভাবিকতা থেকে হয় এবং লাল, হলুদ ও কমলা রঙের সবুজ দেখা যায়)। প্রোটানোপিয়া (লাল কোন পিগমেন্টের কার্যকলাপের ক্ষতি থেকে হয় এবং লাল রঙ কালো, হলুদ, সবুজ ও কমলা রঙের দেখা যায়)।ডিউটেরানোমালি(সবুজ কোন পিগমেন্টের অস্বাভাবিকতা থেকে হয় এবং হলুদ ও সবুজ রঙ লাল বলে মনে হয়)। ডিউটেরানোপিয়া (সবুজ কোণ পিগমেন্টের কার্যকলাপের ক্ষতি থেকে হয় এবং লাল রঙ বাদামী হলদেটে ও সবুজ রঙ ধোঁয়াটে পশমির মতো দেখায়)।

নীল হলুদ বর্ণান্ধতা: এই বিরল ধরণের বর্ণান্ধতা নীল ফটো-পিগমেন্টের সঠিক কার্যকলাপের অভাবের জন্য হয়। এটাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- ট্রিটানোমালি (এটি নীল কোন পিগমেন্টের কাজ নষ্ট হবার জন্য হয় এবং নীল রঙ সবুজ দেখায় এবং হলুদ, লাল ও বাদামী রঙের তফাৎ বুঝা যায় না)।ট্রিটানোপিয়া (নীল কোন পিগমেন্টের অভাবের জন্য হয় এবং নীল রঙ সবুজ দেখায় এবং হলুদ রঙ ধূসর ও বেগুনী মনে হয়)।

৩. সম্পূর্ণ বর্ণান্ধতা: এটা বর্ণান্ধতার বিরল ধরণ, যেখানে যেকোনো ধরণের রঙ চিনতে পারে না। এটা স্বাভাবিক দৃষ্টি শক্তির ক্ষেত্রেও হস্তক্ষেপ করে। এটাকেও দুই ভাগে ভাগ করা যায়- কোন মনোক্রোমাসি (বহুবিধ কোন পিগমেন্টের যথাযথ কার্যকলাপের অভাবের ফলে হয় এবং লাল, সবুজ ও নীল সেল মনোক্রোমাসি হতে পারে)। রড মনোক্রোমাসি (বর্ণান্ধতার বিরল থেকে বিরল ধরণ, যা বিভিন্ন ধরণের ফটো পিগমেন্টের অভাব থেকে হয়। ভুক্তভোগীরা শুধুই সাদা, কালো ও ধূসর রঙ বুঝতে পারে)।

কীভাবে বুঝবেন আপনি বর্ণান্ধ?

 

4.বর্ণান্ধতায় জীবন যখন রঙহীন

বর্ণান্ধতার পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে চোখের স্বাভাবিক ও সাধারণ পরীক্ষা অন্তর্গত।রঙের বিন্দু দিয়ে বিশেষভাবে বানানো চিত্রের মধ্যকার লুকোনো রঙকে সনাক্ত করতে বলা হয় রোগীকে। নকশায় স্বাভাবিক সনাক্তকরণ চিন্তার কারণ নয়। গঠনের অস্বাভাবিক সনাক্তকরণ অনেক সময় রোগ বুঝতে সাহায্য করে। রঙিন বৃত্তের মধ্যে লেখা ৭৪, ৬, ৩, ১২, ৪২, ২৯, ৫, ৪৫ সংখ্যাগুলো যদি দেখতে না পায়, তবে তিনি বর্ণান্ধ। আর যদি দেখতে পায় তবে এ ধরনের রোগ থেকে তিনি মুক্ত।

সমস্যার সমাধান

 

5.বর্ণান্ধতায় জীবন যখন রঙহীন

বর্ণান্ধতার আক্ষরিক অর্থে নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। যেহেতু এটি জীনগত একটি সমস্যা।কালার ফিল্টার গ্লাস ও কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সাহায্য পরিস্থিতির মোকাবিলা করা গেলেও সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয়।তবে লাল-সবুজ কালার-ব্লাইন্ড রোগীদের জন্য দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সামান্য পরিমাণ উন্নতি করা সম্ভব হয়। আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে জেনেটিক রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা হচ্ছে। বলা যায়, এই গবেষণা আগামী দিনে হয়তো নতুন কোনো আশার আলো দেখাতে পারবে।

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –