বুধবার   ১১ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২৭ ১৪২৬   ১৩ রবিউস সানি ১৪৪১

৩০৪

রাজনীতিতে অনন্য দৃষ্টান্ত হতে পারেন মাশরাফি

প্রকাশিত: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে নৌকা প্রতীকে লড়ছেন জাতীয় ওয়ানডে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা।

জনপ্রিয় এ ক্রিকেট তারকার নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে আলাদা মাত্রা পেয়েছে নির্বাচনী আলোচনা। নিভৃত পল্লী থেকে শহরের সরু গলি, চায়ের দোকান থেকে অফিস চত্ত্বর, আড্ডামহল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম; সবই সরগরম এই এক ইস্যুতে। অবশ্য মাশরাফির প্রার্থী হওয়ার আলোচনাটা শুরু হয়েছিল আরো কয়েকমাস আগে।

গত ২৯ মে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল একনেকের এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বললেন, ‘মাশরাফি ও সাকিবের নির্বাচন করার সম্ভাবনা রয়েছে।’ সে থেকেই শুরু হয় নানা আলোচনা। মূলত সেই আলোচনার পালেই হাওয়া পায় মনোনয়নপত্র কেনার পর। সাকিবের নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত বাতিল হলেও মাশরাফির বিষয়টি এরইমধ্যে বেশ এগিয়েছে।

এরইমধ্যে নির্বাচনে আসার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলন করে পরিষ্কার করেছেন মাশরাফি। অর্থাৎ দেশ সেরা ক্রিকেট অধিনায়ক মাশরাফি এখন পুরোদস্তর রাজনীতিক নেতা। এই বাক্যে এসেই মূলত জমে উঠছে আলোচনাটা। নির্বাচন সামনে এদেশে আলোচনার ঝড় নতুন কিছু নয়। যে দেশের প্রতিটি নাগরিকই রাজনীতির প্রতি আগ্রহী সেদেশে নির্বাচনকালীন আমেজ অন্যরকম হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। আমাদের দেশে রাজনীতির অপর নাম দেয়া যেতে পারে নির্বাচন।

নির্বাচন এলেই শুরু হয় সমস্ত হিসাব-নিকাশ। প্রার্থীর ব্যক্তিকর্ম থেকে শুরু করে দলীয় কার্যক্রম, ভুল-ত্রুটি, অর্জন-বর্জন; সবই স্থান পায় নির্বাচনী আলোচনায়। সমস্ত চাপা কথা, পাওয়া না পাওয়ার হিসাব প্রকাশ পায় নির্বাচনের মাঠে। সরগরম থাকে রাজনীতির মাঠ। বলা যায়, উৎসবে পরিণত হয় এটি।

আমাদের দেশে নির্বাচন শুধু রাজনীতিবিদ, তাদের সমর্থক এবং নীরবে-নির্বিঘ্নে শুধু ভোট দেয়ার কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিশু-কিশোর, যুবা, বৃদ্ধ জড়িয়ে পড়ে অনায়াসেই। তাতে জনজীবন রাজনীতির মধ্যে হারিয়ে যায়। পাড়ায় পাড়ায় নির্বাচন কেন্দ্র করে যে অফিসগুলো হয়, সেগুলো একেকটি বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়।

এসব আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে দেখে অভ্যস্ত। আর ব্যতিক্রম কেউ রাজনীতিতে আসলে আলোচনার স্বাদটা ভিন্ন হবে এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু মাশরাফিকে নিয়ে আলোচনা কিছুটা ভাবাচ্ছে। কারণ, ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক আলোচনাই বেশি হচ্ছে। হৃদয়ের মণিকোঠায় রাখা তারকাকে রাজনীতির মাঠে ঠিক মেনে নিতে পারছেন না অনেকেই। কেন পারছেন না এমন প্রশ্নেও আবার খেই হারিয়ে ফেলছেন।

মাশরাফিকে বেশি পছন্দ করার কারণেই তার অনেক সমর্থক চাচ্ছে না মাশরাফি রাজনীতিতে আসুক। পেছনে বিতর্কিত হওয়ার ভয়। একজন মাশরাফি ভক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রিয় মাশরাফিকে ভালবাসতে চাই আজন্ম। তবে রাজনীতিক নেতা হিসেবে নয়। শুধুই ক্রিকেটার হিসেবে।’

আরেকজন লিখেছেন, ‘যে মাশরাফি সবার প্রিয় তার কেন বিশেষ দলে আটকে থাকতে হবে?’ এমন আরো অনেক লেখাই চোখে পড়েছে গত দু’দিনে। লেখাগুলো ভাবনায় ফেলে। আসলেই তো মাশরাফি এখন ১৬ কোটি মানুষের পছন্দের মানুষ। দল-মত নির্বিশেষে সবাই মাশরাফিকে ভালবাসে। কিন্তু এমপি হলে কি তিনি এ ভালবাসা ধরে রাখতে পারবেন? তার নাম ভাঙিয়ে যে চাঁদাবাজি, দখলবাজি হবে না তার কোনো গ্যারান্টি আছে? এখন ক্রিকেটার মাশরাফির জনপ্রিয়তা আছে।

সেটিকে পুঁজি করে হয়তো অনেক সহজেই প্রথমবার এমপি হতে পারবেন তিনি। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনীতিতে টিকতে হলে তার নিজস্ব গ্রুপিং তৈরি করতে হবে। সেই গ্রুপিংয়ের প্রয়োজনেই নানা হামলা-মামলা সমর্থন দিতে হবে। নিজে ভালো থাকলেও গ্রুপের অনেকে প্রতিনিয়ত জড়াবে নানা ঝামেলায়। এগুলো তো মাশরাফিকেই সামলাতে হবে। এরপর রয়েছে প্রতিপক্ষের রটানো কুৎসা, অপকৌশলের বেড়ি, সামাজিক বাধা বিপত্তিসহ নানা ব্যঞ্জনা।

এসব ভাবনা অমূলক নয়। চিন্তা খানিকটা বাড়তেই পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে এসব ভাবনা পিছু ছাড়ে না। বাস্তবতা তো কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। এরআগে অনেক নন্দিত ব্যক্তিই রাজনীতিতে এসে বিতর্কিত হয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনেরও পরিবর্তন প্রয়োজন। আবার এও সত্য, যে দেশের রাজনৈতিক দল যতোটা সভ্য, সু-শৃঙ্খল, সে দেশের গণতন্ত্রের ধারাটা ততটাই পাকাপোক্ত থাকে।

রাজনীতির নামে আমাদের মাঝে যে ভীতির বাস তা দূর করতে স্বচ্ছ ইমেজের মানুষদের রাজনীতিতে আসা জরুরি। ব্যতিক্রম ব্যক্তিদের আমরা রাজনীতির মাঠে চাই। রাজনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনের জন্যই আমাদের সুপ্ত চাওয়া ভালো ইমেজের মানুষেরা রাজনীতিতে আসুক। চলমান সমস্ত ব্যঞ্জনা অতিক্রম করে সৃষ্টি করুক নতুন দৃষ্টান্ত। আশার কথা হচ্ছে, এসবের জন্য যে সাহস, শক্তি, উদ্যমের প্রয়োজন হয় তার সবই মাশরাফির মধ্যে আছে। মাশরাফি নিশ্চয়ই সাধারণ নন। সাধারণ হলে ক্রিকেটেই মাশরাফি টিকে থাকতে পারতেন না।

গত ১৭ বছরে কমপক্ষে ১৫বার ইনজুরিতে পড়েছেন মাশরাফি। অস্ত্রোপচার হয়েছে বেশ কয়েকবার। টেস্ট অধিনায়কত্ব পাবার প্রথম দিনেই ইনজুরিতে পড়েছিলেন, ইনজুরির কারণে মিস করেছেন ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ। তবুও হাল ছাড়েননি।

হাল ছাড়ার ব্যাপারটি যে তার অভিধানেই নেই! প্রতি বার মাশরাফি ইনজুরির সঙ্গে লড়াই করে ফেরেন, আর তার ডাক্তার অস্ট্রেলিয়ান ডেভিড ইয়াং চোখ কপালে তুলে বলেন, ‘এ-ও কি সম্ভব!’ এ ধরনের একটা ইনজুরিই তো শেষ করে দিতে পারে একজন ফাস্ট বোলারের ক্যারিয়ার! সেখানে মাশরাফির বারবার লড়াই করে ফিরে আসার রহস্য কী? উত্তরে এক সাক্ষাৎকারে মাশরাফি বলেছিলেন, ‘বারবার ইনজুরি থেকে ফিরে আসার প্রেরণাও পাই সেসব বীর মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকেই।

এমনও ম্যাচ গেছে আমি হয়তো চোটের কারণে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলাম না। দুই-তিনটা বল করেই বুঝতে পারছিলাম সমস্যা হচ্ছে। তখন তাদের স্মরণ করেছি। নিজেকে বলেছি, ‘হাত-পায়ে গুলি লাগার পরও তারা যুদ্ধ করেছিলেন কীভাবে? তোর তো একটা মাত্র লিগামেন্ট নেই! দৌড়া...।’

গুগলের খোঁজে মাশরাফির দমে না যাওয়ার এমন অসংখ্য গল্প রয়েছে। এগুলোই আশার প্রদীপে তেলের সঞ্চার জোগায়। ক্রিকেটের মাঠের যুদ্ধবাজ মাশরাফি যে রাজনীতির মাঠেও নিজেকে ধরে রাখতে পারবেন সে নিশ্চয়তা দেয় গল্পগুলো। অন্য রাজনীতিকদের মাঝে নিজেকে হারাবেন না মাশরাফি। বরং এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন বলে আশা করাই যায়।

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –