• মঙ্গলবার   ০৪ অক্টোবর ২০২২ ||

  • আশ্বিন ১৮ ১৪২৯

  • || ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

সর্বশেষ:
মুজিববর্ষে সরকারি ঘর পেয়েছে প্রায় ২ লাখ পরিবার: প্রধানমন্ত্রী আগামী প্রজন্মের জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই: রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ অঞ্চলের ৫০ লাখ ভিডিও সরিয়েছে টিকটক: টেলিযোগাযোগমন্ত্রী করতোয়ায় দেশের বৃহত্তম ওয়াই ব্রিজ হবে: রেলমন্ত্রী সুজন বিএনপি সুযোগ পেলে আবার নির্যাতন চালাবে: তোফায়েল আহমেদ

বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২২  

বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র                          
আগামী অক্টোবর মাসে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসছে বাগেরহাটের রামপালের কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট। এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিট আগামী বছরের শুরুতে চালু হবে। এরই মধ্যে বায়ুদূষণ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি কমাতে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরিবেশ ও বায়ুদূষণ কমে আসবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। 

পরিবেশবিদরা বলছেন, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কিছুটা কমতে পারে। তবে দূষণ পুরোপুরি বন্ধ হবে না।

বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক সুভাষ চন্দ্র পান্ডে বলেন, ‘পরিবেশগত প্রভাব কার্যকরভাবে প্রশমিত করতে সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হচ্ছে। ফ্লু গ্যাস নির্গমনের বিস্তৃত বিচ্ছুরণের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু চিমনি (২৭৫ মিটার) রয়েছে। কয়লার জন্য একটি অগ্রিম জাহাজ আন-লোডার নির্মাণের পাশাপাশি একটি সম্পূর্ণ আচ্ছাদিত কয়লা স্টকইয়ার্ড, কম ছাই ও সালফার সামগ্রীসহ উচ্চ গ্রেডের আমদানি কয়লা ব্যবহারসহ অন্যান্য ব্যবস্থা রয়েছে। এতে পরিবেশ দূষণ কমবে।’ 

প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘মেগা পাওয়ারপ্ল্যান্টের দুটি ইউনিট চালু হয়ে গেলে রামপালের কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র হবে বাংলাদেশের বৃহত্তম পাওয়ারপ্ল্যান্টগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ইউনিট-২ আগামী বছরের শুরুর দিকে চালু হবে বলে আশা করছি আমরা।’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের প্রধান ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে চিমনিসহ অত্যাধুনিক যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা যেসব ব্যবস্থা নিয়েছেন, সেগুলো যদি সঠিকভাবে পরিচর্চা, পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং করা হয় তাহলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু পরিবেশ দূষণ পুরোপুরি বন্ধ হবে না। তবে সতর্ক অবস্থায় যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই সুফল পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে অসতর্কতা কাম্য নয়।’

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের প্রধান জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. মোস্তফা সারওয়ার বলেন, ‘পরিবেশগত যে সমীক্ষাগুলো করা হয় তা প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত ও সামাজিক সমীক্ষা। রামপালের তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রেও করা হয়েছে। বায়ু, পানি ও ইকোলজি বা ইকোসিস্টেমের ওপর যে প্রভাব পড়বে তা মিনিমাইস করতে সেখানে বিস্তারিতভাবে চার ডজন মিটিগেশন মেজার উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক ব্যাকআপ ও টেকনোলজিক্যাল ব্যাকআপ বা হিউম্যান রিসোর্স ব্যাকআপ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হল মনিটরিং ব্যবস্থা। যথাযথ মনিটরিং হলে আমরা ক্ষতি কমাতে সক্ষম হবো। আর শুরুতেই পরিবেশগত নিরীক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে থেমে গেলে চলবে না। এটা চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিটি স্তরে স্তরে মনিটরিং করতে হবে, যা জরুরি এবং সময়ের দাবি।’

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘বিদেশ থেকে আনা মানসম্পন্ন কয়লা নিরাপদভাবে ঢেকে পরিবহন করার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের যাতে কোনও ক্ষতি না হয়, সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে আনা কয়লা দিয়ে পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলছে এখন। চারটি কোল ডোম্বের মধ্যে একটি শতভাগ প্রস্তুত, বাকিগুলোর কাজও চলমান। কয়লা খালাসে তৈরি হয়েছে জেটি। জাহাজ থেকে কয়লা আবৃত অবস্থায় চলে যাচ্ছে কোল ডোম্বে। এরই মধ্যে প্রথম ইউনিটের যন্ত্রপাতি এক দফা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ। চলতি সপ্তাহে আরেকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব কাজ শেষ হবে। অক্টোবরে এটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও এগিয়ে চলেছে। আগামী বছর মার্চের মধ্যে সেটিও চালু হবে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) খুলনার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘রামপালে যেসব টেকনোলজি ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে সেগুলো খুবই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন। এসব টেকনোলজি সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেই। কিন্তু এগুলোর ব্যবহার ও মনিটরিংয়ের যে ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে, তা দিয়ে দূষণ কমানো যাবে কিনা আমাদের সন্দেহ রয়েছে। যদি কমানো যায় তাহলে সুফল আসবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রচুর কয়লা ব্যবহারের ফলে প্রকল্প থেকে বের হওয়া পানি প্রচণ্ড গরম থাকবে। সে পানি ঠান্ডা করে নদীতে ফেলা হবে বলে বলা হচ্ছে, যা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। কারণ, ওই পরিমাণ পানির চাপ সামলে তা ঠান্ডা করে নদীতে ফেলা কঠিন কাজ। তাই যে যাই বলুক না কেন, গরম পানি নদীতে পড়বেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে প্রচুর কয়লার প্রয়োজন হবে। যা সুন্দরবনের নদনদী দিয়ে আনতে হবে। তাই দুর্ঘটনাও ঘটবে বলা যায়। ইতোমধ্যে কয়লা আমদানি করার সময় বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। উৎপাদন শুরু হলে দুর্ঘটনার মাত্রা বেড়ে যাবে। ফলে এসব কয়লা নদীতে পড়ে বায়ু, পরিবেশ ও ইকোলজিক্যালের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’ 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মোংলা অঞ্চলের আহ্বায়ক মো. নূর আলম শেখ বলেন, ‘কয়লা যে খারাপ প্রভাব আছে তা নিয়ে জলবায়ু সম্মেলনে আলোচনা করেছেন বিভিন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রীরা। মানুষের স্বাস্থ্য, প্রকৃতি, পরিবেশ-প্রতিবেশ সবকিছুরই ক্ষতি করবে কয়লা। এখন ক্ষতি কতটুকু কমে তা দেখার বিষয়।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘নানা কারণে রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র করছে সরকার। তবে এরইমধ্যে সরকার কিছুটা হলেও পিছিয়ে এসেছে। রামপালে যত প্রকল্প হওয়ার কথা ছিল ততটা কিন্তু হচ্ছে না। চার ভাগের একভাগ হচ্ছে। এই প্রকল্প বেশি দিন চলবে বলে মনে হয় না। তবে ক্ষতি যেটা হওয়ার তা আমাদের পুষিয়ে দিতে হবে। ওখানে মিল চললে বাড়িঘর কাঁপবে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো। এজন্য আমরা বলছি, এখানে এই প্রকল্পের প্রয়োজন নেই।’

দূষণের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘ভারতের পাশাপাশি জার্মানি থেকে আনা যন্ত্রপাতি দিয়ে সর্বাধুনিক এই কেন্দ্রটি তৈরি করা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ যেসব দেশ থেকে পাবো, কয়লা আনা হবে। গভীর সমুদ্রে বড় বার্জ থেকে জেটি, সেখান থেকে কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত কয়লার নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন নিশ্চিত করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় এই অঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু চিমনি তৈরি করা হয়েছে রামপালে। ডিজাইন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা মনে করি, পরবর্তী ১০ বছর নয়, ৫০ বছরেও এখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হবে না। ভালো প্রতিষ্ঠান দিয়ে আমরা জরিপ করেছি, এটা চলমান থাকবে। ক্ষতিকর কিছু হলে তো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।’

প্রকল্পের বৈশিষ্ট্যগুলোর বিবরণে জানা গেছে, প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে স্থাপন করা হচ্ছে ১৩২০ মেগাওয়াটের রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র। মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট ভারত সরকারের রেয়াতি অর্থায়ন প্রকল্পের অধীনে নির্মিত হচ্ছে। ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেডের (বিএইচইএল) জন্য বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) এটি নির্মাণ করছে। ৬৬০ মেগাওয়াট করে দুটি সর্বমোট ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১ সফলভাবে গত ১৫ আগস্ট জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।

একটি সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলমান ভারত সফরের সময় তিনি এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ শেষ করার ঘোষণা দিতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে। গতকাল সোমবার (৫ সেপ্টেম্বর) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার দিনের সফরে ভারতে গেছেন। পরদিন মঙ্গলবার নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কথা রয়েছে। ওই বৈঠকের পরই রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কাজ সম্পন্নের ঘোষণা আসতে পারে।