• বুধবার   ৩০ নভেম্বর ২০২২ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৬ ১৪২৯

  • || ০৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সর্বশেষ:
ক্ষমতায়ন ছাড়া সমাজে নারীর অবস্থান উন্নত হবে না: প্রধানমন্ত্রী অপপ্রচারকারীদের কনস্যুলার সেবা দেবে না কানাডার বাংলাদেশ মিশন ‘দেশের ফুটবল দলকে বিশ্বকাপের উপযোগী করতে কাজ চলছে’ ট্রেনের ধাক্কায় ইউএনও অফিসের নৈশপ্রহরীর মৃত্যু ‘পলিথিন প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে’

কারমাইকেলে ১০৬ বছরের শ্বেত শুভ্র ভবন

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ১৫ নভেম্বর ২০২২  

কারমাইকেলে ১০৬ বছরের শ্বেত শুভ্র ভবন                       
ক্যাম্পাস জুড়ে সবুজে সমারোহ। রয়েছে দুর্লভ বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা। চোখ ধাঁধানো স্থাপত্য কীর্তি নিয়ে ১০৬ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে কারমাইকেলের শ্বেত শুভ্র মূল ভবন। বিশাল মাঠ, প্রশাসন ভবন, শহিদ মিনার, ভাস্কর্য, শ্রেণিকক্ষ, মুক্তমঞ্চ, ক্যাফেটেরিয়া ও ছাত্রাবাসে হাজার হাজার স্মৃতি।

১৯১৬ সালে স্থাপিত এই কলেজের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। কলেজটি শুরুর পর থেকে রংপুর অঞ্চলের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে রেখে আসছে ব্যাপক অবদান। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, শিক্ষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ এমন কোনো সংগ্রাম নেই, যে আন্দোলনে ভূমিকা রাখেননি কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

মুক্তিযুদ্ধে শহিদ এই কলেজের শিক্ষক অধ্যাপক শাহ্ মোহাম্মদ সোলায়মান, অধ্যাপক আব্দুর রহমান ও অধ্যাপক কালাচাঁদ রায়, অধ্যাপক সুনীল বরণ চক্রবর্তী, অধ্যাপক রামকৃষ্ণ অধিকারী, অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন রায়। ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন কারমাইকেল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি বীর মুক্তিযোদ্ধা খোন্দকার মুখতার ইলাহী চিনু, ছাত্রনেতা শহীদ গোলাম গৌওছ নওশা ও শরিফুল আলম মকবুল।

এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাঠ চুকিয়ে বেরিয়ে গেছেন অনেক জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি। যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে উজ্জ্বল ভূমিকা রেখে চলেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, বিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী ও তেভাগা আন্দোলনের নেতা মণিকৃষ্ণ সেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সাবেক সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান, সংসদের প্রথম স্পিকার শাহ আব্দুল হামিদ, বাংলাদেশ সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য এম আব্দুর রহিম, চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দীন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরসহ অনেকে।

দর্শন বিভাগের ছাত্রী সুমাইতা হোসেন সৌমিতা জানান, কলেজে আসলে প্রাণ ভরে যায়। বিশাল ক্যাম্পাস আর গাছপালা দিয়ে ছায়ায় ঘেরা এই কলেজ ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ভরা। আমাদের কলেজের সুনাম দেশ বিদেশে ছড়িয়ে আছে। এই কলেজের অনেক শিক্ষার্থী বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। 

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী নোরা তাবাসুম নৌরী জানান, কারমাইকেল কলেজ বাংলাদেশের প্রতিষ্টিত কলেজের মধ্যে এটি অন্যতম। এর সুনাম বিদেশের রয়েছে।

কলেজের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক জিল্লুর রহমান জানান, ২৯ বছর ধরে কারমাইকেল কলেজে শিক্ষকতা করছি। এটা আমার জন্য অনেক ভালোলাগার। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছয়জন শিক্ষক, তিনজন শিক্ষার্থী জীবন দিয়েছেন। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেক অবদান আছে।

কলেজের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম জানান, কারমাইকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সুনামের কারণে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অনেক রাজ্য থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে এসে লেখাপড়া করেছেন। আসলে কারমাইকেল কলেজ নিজেই একটি ইতিহাস।
 
কলেজের মূল ভবনটি ৬১০ ফুট লম্বা ও ৬০ ফুট প্রশস্ত। স্থাপত্যশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। ভবনটি রংপুরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হওয়ায় বছরজুড়ে দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটকের আগমন ঘটে এই কলেজে। প্রকৃতির অপরূপ শোভা রয়েছে এই কলেজটিতে।

এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফটক পেরুলেই সড়কের দুই ধারে রয়েছে অসংখ্য গাছপালা। কলেজ প্রতিষ্ঠাকালীন সময় রোপণ করা হয় বিরল প্রজাতির কাইজেলিয়া গাছ। এই গাছ বিশ্বে হাতেগুনা কয়েকটি রয়েছে।  

১৯১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কলেজের মূল ভবনের উদ্বোধন করেন বাংলার তৎকালীন গভর্নর আর্ল অব রোনাল্ডস। ১৯৬৩ সালের ১ জানুয়ারি কলেজটি সরকারিকরণ করা হলে অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ বাড়তে থাকে। 

কলেজের গোবিন্দ লাল-জিএল হোস্টেল, কারমাইকেল মুসলিম-সিএম হোস্টেল, কাশিম বাজার-কেবি হোস্টেল বহন করছে ইতিহাসের নানান সাক্ষ্য। মূল ভবনের পূর্বে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মারক ভাস্কর্য, যা নতুন মাত্রা যোগ করেছে মূল ভবনের নান্দনিকতার। 

দক্ষিণে শহীদ মিনার। রয়েছে প্রায় ৭০ হাজার বইয়ের একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। উত্তর-পশ্চিম কোণে রয়েছে একটি উন্মুক্ত মঞ্চ, যা বাংলামঞ্চ নামে পরিচিত। কলেজের সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র।  

কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আমজাদ হোসেন জানান, ১৯১৬ সালে এই কলেজটি প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত এ অঞ্চলের মানুষের কাছে আলোর বাতিঘর হয়ে জ্ঞান দান করছে। কিন্তু এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত হোস্টেল ব্যবস্থা, বাস সংকট নিরসন, সড়ক সংস্কার করা অতি জরুরি।

১৯১৬ সালের ১০ নভেম্বর অবিভক্ত বাংলার গভনর লর্ড ব্যারন কারমাইকেল এই কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তারই নামানুসারে নামকরণ করা হয় কারমাইকেল কলেজ। শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন বাঙালি জমিদারের সহযোগিতায় শিক্ষাপপ্রতষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীকে পাঠদান করাচ্ছেন ১৮০ জন শিক্ষক। উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি কোর্সের পাশাপাশি অনার্সে ১৮টি এবং মাস্টার্সে ১৬টি বিষয়ে এখানে পাঠদান করা হয়।