রোববার   ১৭ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২ ১৪২৬   ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

বিয়ের চেয়ে উপার্জনশীল হওয়াটা মেয়েদের জন্য বেশি দরকারীঃ মানসী রায়

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত : ১০:৩৭ এএম, ৮ নভেম্বর ২০১৯ শুক্রবার

'প্রাক্তন ' ছবিটার কথা মনে আছে? বছর তিনেক আগের এই অত্যন্ত জনপ্রিয় ছবিতে দেখানো হয়েছিল এক উচ্চাকাঙ্খী নারী, তার উচ্চাকাঙ্খাহীন, স্ত্রীর প্রতি উদাসীন, গোঁয়ার, ক্ষুদ্র মানসিকতার স্বামীর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে না পেরে শেষমেশ বিবাহবিচ্ছেদের পথ বেছে নেয়। এই ঘটনার বেশ কিছু বছর পরে সেই স্বামী (ছবির নায়ক) এবং তার বর্তমান স্ত্রীর সঙ্গে তার ট্রেনের কামরায় হঠাৎ করেই দেখা হয়ে যায়। এর পর ছবি যত এগোতে থাকে ছবির গল্প ও চরিত্ররা আস্তে আস্তে দর্শককে বোঝাতে থাকে একটি মেয়ের কাছে সংসারের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব ঠিক কতখানি! ঠিক কতটা আপোষ এবং ত্যাগ করতে হয় একটি মেয়েকে সংসার টিকিয়ে রাখতে গেলে। পুরো ছবি জুড়েই এই বিষয় নিয়ে নায়কের বর্তমান স্ত্রী  প্রাক্তন স্ত্রীকে জ্ঞান দান করে চলেন এবং শেষপর্যন্ত দর্শকের প্রত্যাশা মতোই প্রাক্তনের বোধোদয় হয় ও সে তার পূর্ব সংসার জীবনে নিজের 'ভুল' গুলো বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়। ছবি শেষ হয়। দর্শকও খুশি। মহিলা দর্শকেরা আরও খুশি । মূল সমস্যাটা কিন্তু একই জায়গায় অবিচল থেকে যায় – মেয়েদের স্বামী – সংসারের কনসেপ্ট বা মজ্জাগত ধারণা।  স্বামী সংসারকে এই রকম ভাবে গ্লোরিফাই সিনেমা-সিরিয়াল সর্বত্রই করা হয়ে থাকে। এর কারণ আর কিছুই না, 'সংসার' শব্দটার প্রতি মানুষের, আরও নির্দিষ্ট করে বললে, মেয়েদের বিশ্বাস এবং এই ধরণের গল্পের মধ্যে দিয়েই মেয়েদের বর্তমান সামাজিক অবস্থান ও তাদের প্রায়োরিটি পরিষ্কার হয়ে যায়।

বলাই বাহুল্য, আজও, এই একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও অধিকাংশ মেয়েই বিবাহোত্তর সংসারকেই জীবনযাপনের এক ও একমাত্র অবলম্বন বলে মনে করে বা তাদের সেটাই মনে করানো হয়। যে মেয়েটির গায়ের রঙ কালো বা যে মেয়েটি তথাকথিত অসুন্দর, তার মাথায় ছেলেবেলা থেকেই তার বিয়ে নিয়ে এবং তার বাবার সেই সংক্রান্ত খরচের বিপুলতার চিন্তা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এগুলো বহুল চর্চিত, বহুল বর্ণিত, বহুল সমালোচিত অথচ সজ্ঞানে বহুল উপেক্ষিত বিষয়। সমস্যা হচ্ছে, বেশির ভাগ মেয়েই কিন্তু এতে কোনও আপত্তি করে না। যেন তেন প্রকারেণ তারা বিয়েটা করতেই চায়। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বৈবাহিক সম্পর্ক তৈরিই হয় মূলতঃ অর্থের ভিত্তিতে। মেয়ের বাবা অর্থ সহযোগে ( খালি হাতে কখনওই নয়) মেয়েকে তুলে দেন একটি পুরুষের হাতে, যাতে সেই পুরুষটি পরবর্তীকালে মেয়েটির সমস্ত খরচাপাতি এবং দেখভালের দায়িত্ব নেয়। সেজন্যই একটি মেয়ের কাছে তার স্বামী-সংসার এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ এক হয়ে যায়। ফলস্বরূপ ,যে মেয়েটি পুরোপুরি স্বামীর উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল, নিজের ভরণপোষণের বিনিময়ে সে সংসার নামক স্বেচ্ছাদাসত্ব মাথা পেতে নেয় বা নিতে বাধ্য হয়। এই রকম অনেক মেয়েই আছে যারা দিনের পর দিন স্বামীর কাছে অত্যাচারিত হওয়ার পরও তাকে ছেড়ে আসে না। এর প্রথম কারণটা যে অর্থনৈতিক,  সেটা সহজেই অনুমেয়। ধরে নেওয়া যেতে পারে দ্বিতীয় কারণটা হয়তো সামাজিক। কিন্তু এর একটা তৃতীয় কারণও আছে – সংসারের মোহ! সংসারই তার জগৎ। সেটাই তার পরিচয়, আইডেন্টিটি! সেখান থেকে বেরিয়ে এলে কে সে? মা, কাকিমা, জ্যেঠিমা, মামীমা, বৌদি বা কারুর স্ত্রী – এই পরিচয় এবং ডাকে সে নিজেকে সুরক্ষিত বোধ করে! মেয়েদের এই বোধটাই যে সর্বনাশা, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!

অনেক ক্ষেত্রেই, বা বলা ভালো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছেলের বিয়ে দেওয়ার পরে বাড়ির পরিচারিকাকে তার কাজ থেকে অব্যহতি দেওয়া হয় তার জায়গাটা পুত্রবধূকে দেওয়া হবে এই মানসিকতায়। ছেলের পরিবার তো অবশ্যই, মেয়েটির পরিবার এমনকি মেয়েটি নিজেও এর মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করে না, উপরন্তু সর্বত ভাবে মনে করে সেই নতুন সংসারের খুঁটিনাটির দায়িত্ব এর পর থেকে তার। বিয়ে হয়েছে অথচ শ্বশুরবাড়িতে সংসারের কাজ করতে হয় না- এটা মেয়েদের কাছে প্রায় অবিশ্বাস্য এবং বিস্ময়কর একটি ব্যাপার। কারণ একটাই, স্বামী, সংসার ও পরবর্তীতে সন্তান পালন – এর বাইরে মেয়েদের ভূমিকা নিয়ে মেয়েরা নিজেরাই আত্মবিশ্বাসী নয়। কেবল অর্থনৈতিক ভাবে স্বামীর ওপর নির্ভরশীল গৃহবধূরাই নয়, অনেক চাকুরিরতা, রোজগারী মহিলাও সংসার সম্বন্ধে অত্যধিক সচেতন, সংসারকে কেন্দ্র করেই তাঁদের যাবতীয় ভাবনাচিন্তা এবং তাঁর বাইরের জগৎ বা কর্মজগৎটাকে গৌণ ও স্বামী-সংসারকে মুখ্য ভেবে তৃপ্তি লাভ করেন। বেশকিছু কাজের জায়গায় নারীরা পুরুষদের চেয়ে কম বেতন, কম পারিশ্রমিক পান (ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যার অন্যতম উদাহরণ) এবং এই বৈষম্য তাঁরা অনেকেই বিনা প্রতিবাদে মেনে নেন কারণ তাঁরা নিজেরাই বিশ্বাস করেন তাঁদের স্বামী / পুরুষ সঙ্গীর রোজগারটাই আসল, তাঁদেরটা অতিরিক্ত, না হলেও চলে!

একই ভাবে, সংসারের চাপ নিজেদের প্রতিভার চর্চা বা স্ফূরণের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে – এই ধরণের অনুযোগও নিতান্তই অজুহাত বই কী!  এসব ক্ষেত্রে তাঁরা যে আসলে নিজেদের গুণের জোরে পরিচিত হওয়ার চেয়ে সংসারে পাঁচজনের একজন হতে চাওয়াকেই বেশি প্রায়োরিটি দিতে চেয়েছেন বা দিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনও দ্বিমতের অবকাশ নেই।

ব্যতিক্রম যে নেই, তা তো নয়! প্রচুর মহিলা আছেন যাঁরা এই রকম ছাঁচে ঢালা নন। তবুও, কোনও সুউপায়ী, স্বাবলম্বী, আত্মনির্ভর বিবাহবিচ্ছিন্না নারীকে যখন দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার বিয়ে করতে দেখা যায়, তখন বিয়ে যে শুধু স্থায়ী পুরুষসঙ্গী এবং তথাকথিত 'রক্ষক'-এর মিথ নয়, একটা সুস্থ সংসারের বাসনা, সেটা মনে হওয়া বোধকরি খুব অস্বাভাবিক না! এখানে পরিচয় নয়, অবলম্বনটাই প্রধান।

অন্যদিকে, অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে এই সংসার সম্পর্কিত সমস্যাগুলো আরও জটিল এবং মনস্তাত্ত্বিক। অনেককেই দেখা যায় বিপথে চলে যেতে এবং সেই সিদ্ধান্ত বা জীবনের জন্য তাঁরা তাঁদের বিয়ে না হওয়াকেই দায়ী করেন। আবার এমনও কেউ কেউ আছেন, যাঁরা স্বামী, সন্তান, শ্বশুর, শাশুড়ী সহ নিজের একটি সংসার কল্পনা করে নেন এবং সবার সঙ্গে সেই কাল্পনিক সংসারের গল্প খুব স্বাভাবিক ভাবেই করেন যাতে কেউ তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা না ভাবে। অর্থাৎ, বিবাহোত্তর সংসার সমাজের একটি প্রয়োজনীয় উপাদানও বটে!

আশ্চর্যের বিষয় হল, এই বিপুল সংখ্যক নারী যাঁরা স্বামী এবং সংসারকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকেন বা বাঁচার কথা ভাবেন, তাঁদের খুব কম সংখ্যকই কিন্তু নিজে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার কথা ততক্ষণ ভাবেন না যতক্ষণ না তাঁদের স্বামী বা পুরুষসঙ্গীটি উপার্জনে অক্ষম হয়ে পড়ছেন। এখানেও সেই সংসার বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাই মুখ্য, নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা নয়।

কাজেই, মেয়েদের আগে বুঝতে হবে যে, সংসার বস্তুতঃ একটি পরিবারে থাকা প্রতিটি মানুষের সম্মিলিত যাপন। এটি চালনা করার জন্য প্রত্যেকেরই সমান ভূমিকা থাকা উচিত। সংসারে থাকাটা একটা চয়েস বা বাধ্যতা, কিন্তু তা কোনওভাবেই কারুর একমাত্র পরিচয় হতে পারে না। উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত স্তরে মেয়েদের কদর কম হওয়া বা বিয়ের সময় পণপ্রথার ভয়ে অবৈধ ভাবে কন্যাভ্রূণ হত্যার জন্য অনেকাংশে দায়ী কিন্তু মেয়েদের এই শুধুমাত্র স্বামী-সংসার অবলম্বন করে থাকার মানসিকতা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চারিয়ে গেছে এবং এখনও যাচ্ছে।  ঘরের সাংসারিক কাজকর্মকে অধিকাংশ মানুষই 'কাজ' বলে মনে করে না যেহেতু তা অর্থকরী নয়। সংসার যে কেবলমাত্র পারস্পরিক সহাবস্থানের একটি পদ্ধতি, জীবনধারণের অবলম্বন নয় এবং বিয়ের চেয়ে উপার্জনশীল হওয়াটা যে মেয়েদের জন্য বেশি দরকারী, মেয়েরা যতদিন না নিজেরা বুঝছে, নারীবাদ এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকার শুধুমাত্র কথার কথা হয়েই থেকে যাবে।