• বৃহস্পতিবার   ০৮ ডিসেম্বর ২০২২ ||

  • অগ্রাহায়ণ ২৪ ১৪২৯

  • || ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সর্বশেষ:
সাংস্কৃতিকভাবে মেধাবীদের মেধা বিকাশের কাজ করছে সরকার গাইবান্ধার চরে যাতায়াতে একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি নীলফামারীতে দেরিতে স্কুলে আসায় ৮ শিক্ষককে শোকজ জলঢাকায় নবাগত এসিল্যান্ডের যোগদান খানসামায় আনসার ও ভিডিপি সমাবেশ অনুষ্ঠিত

অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র আইভি রহমান

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ৭ জুলাই ২০২২  

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক

বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির ইতিহাসে আইভি রহমান ও জিল্লুর রহমান ছিলেন এমন একটি ঐতিহাসিক জুটি বা পরিবার, যে পরিবারের দুজনই সম্পৃক্ত ছিলেন ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন থেকে শুরু, বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রগতিশীল সব আন্দোলন-সংগ্রামে। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এই পরিবার গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গেও পারিবারিকভাবে সম্পর্কিত ছিলেন আইভি। তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার খালাশাশুড়ি এবং তাঁর বড় বোন শামসুন্নাহার সিদ্দিক শেখ রেহানার শাশুড়ি।

আইভি রহমান ও জিল্লুর রহমানের দুই মেয়ে, তানিয়া বখ্ত ও তনিমা রহমান এবং এক ছেলে নাজমুল হাসান পাপন।

১৯৫৮ সালের ২৭ জুন মো. জিল্লুর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন আইভি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তাঁদের বিবাহের প্রধান সাক্ষী। তাঁরাও আজীবন বঙ্গবন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞ থেকেছেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করেছেন। বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে শত প্রতিকূলতাকে ভেদ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার পাশে থেকেছেন। একজন মা, একজন সমাজকর্মী, একজন স্ত্রী-সহযোদ্ধা আইভি রহমান নিজে রাজনীতি করেছেন, পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জিল্লুর রহমানের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো ছায়াসঙ্গী হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন।

১৯৪৪ সালের ৭ জুলাই ভৈরবের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে আইভি রহমানের জন্ম। তিনি ছিলেন আট বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে পঞ্চম। তাঁর পিতা জালালউদ্দিন আহমেদ ছিলেন ঢাকা কলেজের স্বনামধন্য অধ্যক্ষ। পারিবারিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কারণে শৈশবেই আইভি রহমান সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন। রাজনীতিতে অধিক সক্রিয় হন বিবাহের পর। ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় তিনি রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে তিনি ২০০৩ সাল পর্যন্ত নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত আইভি রহমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রাইফেল ও ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষণ নিয়ে অন্য নারীদের প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ও উদ্যম সৃষ্টির জন্য জয় বাংলা বেতারেও তিনি কাজ করেন।

আইভি রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ ডিগ্রিধারী। তিনি লেখালেখি করেছেন, নারী জাগরণ ও প্রগতিশীল সমাজ নির্মাণে ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশ মহিলা সমিতি পুনর্গঠনে রয়েছে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত তিনি জাতীয় মহিলা সংস্থা ও জাতীয় মহিলা সমিতির সভাপতি ছিলেন। জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

আইভি রহমান ছিলেন শান্তিপ্রিয় মানুষ। হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্যকে তিনি মনে-প্রাণ ঘৃণা করতেন। অকালে অন্যায়ভাবে ঘাতকরা তাঁর তাজা প্রাণ কেড়ে নিলেও নিতে পারেনি তাঁর আদর্শ ও কর্ম। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তিনি গিয়েছিলেন জন্মভূমি ভৈরবে। বন্যাদুর্গত মানুষকে ত্রাণসামগ্রী দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ ও সমাজসেবায় গৌরবোজ্জ্বল অবদানের জন্য আইভি রহমানকে (মরণোত্তর) স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত করা হয় ২০০৯ সালে। তাঁর জন্মস্থান ভৈরবের চণ্ডিবড় গ্রামে নির্মাণ করা হয়েছে আইভি রহমান স্মৃতিস্তম্ভ। তাঁর নামে নামকরণ হয়েছে জিল্লুর রহমান মহিলা কলেজের ছাত্রীনিবাস এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের একটি তোরণ। আইভি রহমান ও জিল্লুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ভৈরবের বাড়িটির নামও রাখা হয় আইভি ভবন। এসব স্মৃতি দেখে ভৈরববাসীর মনে পড়ে জিল্লুর রহমান ও আইভি রহমান ছিলেন তাঁদের কত আপন, কত প্রয়োজনীয় ও গর্বের স্বজন।   

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য প্রকাশ্য সমাবেশে নারকীয় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান গুরুতর আহত হন এবং ২৪ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। বাংলার মানুষ আজও মেনে নিতে পারেনি তাঁর অকাল প্রয়াণ। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং পরিশ্রমী, সংগ্রামী, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র মহীয়সী আইভি রহমানের জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : শিক্ষা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ
[email protected]