• মঙ্গলবার   ০৪ অক্টোবর ২০২২ ||

  • আশ্বিন ১৮ ১৪২৯

  • || ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

সর্বশেষ:
মুজিববর্ষে সরকারি ঘর পেয়েছে প্রায় ২ লাখ পরিবার: প্রধানমন্ত্রী আগামী প্রজন্মের জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই: রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ অঞ্চলের ৫০ লাখ ভিডিও সরিয়েছে টিকটক: টেলিযোগাযোগমন্ত্রী করতোয়ায় দেশের বৃহত্তম ওয়াই ব্রিজ হবে: রেলমন্ত্রী সুজন বিএনপি সুযোগ পেলে আবার নির্যাতন চালাবে: তোফায়েল আহমেদ

শেখ রেহানা: আত্মসচেতন ও ঔদার্যে অনন্যা  

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২  

শেখ রেহানা: আত্মসচেতন ও ঔদার্যে অনন্যা                          
গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের আন্তিগোনে ট্র্যাজেডিতে ইডিপাসের কন্যা আন্তিগোনে রাজা ক্রিওনের নির্দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের ভাইয়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিল। রাজার আইনি হুকুম না মেনে আন্তিগোনে রাজশক্তির বিরুদ্ধে পারিবারিক ধর্মে প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার দুঃসাহসিকতা দেখিয়ে প্রতিবাদী নারী চরিত্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। সাহসী উচ্চারণে রাজা ক্রিওনের প্রশ্নের জবাবে নিজের ভাই পলিনিকেসের প্রতি শোক প্রকাশ ও তার শব সংরক্ষণ করার যুক্তি তুলে ধরেছিল। ঐ পরিস্থিতিতে রাজত্বের স্বার্থ রক্ষা করে নিজেকে মহিমান্বিত করেনি সে। এজন্য আন্তিগোনে কালোত্তর এক নৈতিকতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এক প্রতিবাদের নাম, সাহসের নাম আন্তিগোনে। পরিপ্রেক্ষিত এক রকম নয়; কিন্তু আন্তিগোনের সাহস, স্বজনের জন্য আত্মত্যাগ এবং খুনি চক্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজে কষ্ট স্বীকার করার প্রত্যয় লক্ষণীয় শেখ রেহানার জীবনেও। আসলে খুনি ও পাকিস্তানপন্থিদের বিরুদ্ধে নৈতিক সংঘাতের কাহিনী রয়েছে শেখ রেহানার জীবনেও। আত্মসচেতন এই নারীর ঔদার্যের পরিচয়ও অনন্য।

১৩ সেপ্টেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানার জন্মদিন। ১৯৫৫ সালের এই দিনে তিনি টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৫৪ সালের ৩০ মে থেকে ১৯৫৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। পুনরায় তিনি কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন ১৯৫৮ সালের ১২ অক্টোবর। অর্থাৎ শেখ রেহানার জন্ম থেকে বেশ কয়েক বছর বঙ্গবন্ধুর মুক্ত জীবনে বিচরণের সুযোগ ঘটেছিল। বড় মেয়ের মতোই ছোট মেয়ের প্রতি ছিল তার অপত্যস্নেহ ও মমত্ববোধ। তার প্রকাশ রয়েছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’য়। যেমন :একটি অংশ—‘ছোট মেয়েটার (শেখ রেহানা) শুধু একটা আবদার। সে আমার কাছে থাকবে। আর কেমন করে কোথায় থাকি তা দেখবে। সে বলে, থেকে যেতে রাজি আছি।’ (১৫ জুন ১৯৬৬, বুধবার, কারাগারের রোজনামচা) ১৯৭৫ সালে বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যদের হারানো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বাল্যকাল থেকেই পিতার রাজনৈতিক আদর্শে বেড়ে উঠেছেন। এজন্য তাদের ঔদার্য বিশাল। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক ঘটনা দিয়ে এই উদার হৃদয়ের মানুষদের আমরা চিনতে পারি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর শেখ রেহানা যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। ব্রিটিশ সরকার তার প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। সেখানেই অদ্যাবধি অবস্থান করছেন তিনি। তবে প্রতি বছর বাংলাদেশে কিছুদিনের জন্য অবস্থান করেন। 
২০০৭-২০০৮ সালে সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনাকে বন্দি করা হলে শেখ রেহানা তার পক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হাল ধরেন। নেত্রীর মুক্তির জন্য দেশ-বিদেশে আইনি লড়াই চালিয়ে যান। ২০০৯ সাল থেকে বড় বোনকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে সহযোগিতা করে আসছেন। তিন সন্তানের জননী শেখ রেহানার স্বামী শফিক আহমেদ সিদ্দিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং ও ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। ছেলে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করছেন। আর দুই কন্যা— টিউলিপ সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিকও উচ্চশিক্ষিত। টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা হিসেবে ব্রিটেনের সর্বশেষ নির্বাচনে লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্ন আসনে টানা তৃতীয় বারের মতো এমপি হন। ২০২০ সালে তিনি ব্রিটেনের শিশুবিষয়ক ছায়ামন্ত্রী পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। তিনি এতদিন শ্যাডো আর্লি ইয়ারস মিনিস্টার (প্রাক-প্রাথমিক ছায়ামন্ত্রী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর প্রতিকূল পরিস্থিতি জয় করে শেখ রেহানা নিজের সন্তানদের সুশিক্ষিত ও রাজনীতিসচেতন করে গড়ে তুলেছেন। শেখ রেহানার এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার শক্তি আন্তিগোনের সাহসের কথা মনে করিয়ে দেয়। আসলে আন্তিগোনে স্পর্ধা দেখিয়েছিল। রাজা ক্রিওনকেও সে বুঝিয়ে দিয়েছিল স্বৈরাচারের আইন অমান্য করে সে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছে কেবল ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে। আপন বোন ইসমেনি কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা থেকে বিরত ছিল।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরে দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকতে হয়েছে বড় বোন শেখ হাসিনাসহ শেখ রেহানাকে। পঁচাত্তর-পরবর্তী সরকারগুলো কেউ তাদের প্রতি সদয় হয়নি। শেখ হাসিনা ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড়। তার তিন ভাই শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পিতামাতা, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে নৃশংসভাবে নিহত হন। ১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই শেখ হাসিনার সঙ্গে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন বলেই প্রাণে রক্ষা পান তিনি। কলেজপড়ুয়া রেহানার লেখাপড়া বিঘ্নিত হচ্ছিল দেশে। কারণ তাদের ছোট বাড়িতে অনেক মানুষ; আর রাজনৈতিক পরিবারে বিচিত্র মানুষের আনাগোনা বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এজন্য বড় বোনের সন্তানদের দেখাশোনা ও নিজের পড়ার কাজের সুবিধার জন্য মাতৃনির্দেশ পালন করে বিদেশে পাড়ি দেন তিনি। রাষ্ট্রপতি হয়েও বঙ্গবন্ধু একটি ছোট বাড়িতে থাকতেন। কারণ বেগম মুজিবের বিশ্বাস ছিল বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে গেলে তার সন্তানরা নষ্ট হয়ে যাবে। এজন্য কখনো রাষ্ট্রপতি ভবনে বসবাসের উদ্দেশ্যে যাননি বরং সাদামাটা জীবন যাপন করেছেন। দেশে ফিরতে না পেরে ১৯৭৬ সালে রেহানা লন্ডনে পৌঁছান। বিয়ে করেন পিতার পছন্দের পাত্রকেই। ১৯৭৭ সালে শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে তিনি প্রথম রাজনৈতিক বক্তব্য দেন সুইডেনে একটি কনফারেন্সে। ১৯৮০ সালে শেখ হাসিনা লন্ডনে বক্তব্য রাখেন। এ সময় দুই বোন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা নিয়ে সোচ্চার হন।

মূলত এ দেশে মানুষের ভালোবাসা ছাড়া বঙ্গবন্ধু পরিবার কিছুই পায়নি। উপরন্তু শেখ রেহানা রাষ্ট্রের কাছে থেকে কিছুই নেননি। রাষ্ট্রপতি পরিবার হিসেবে তো রাষ্ট্রের কাছ থেকে সবাই পায়, শুধু তারাই কিছু নেননি। কারণ তার ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ নেই; ছিল না কখনো। এজন্য জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেছেন; জনগণের দিকে তাকিয়েছেন; জনগণের জন্য কিছু করেছেন। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রীয় সম্পদে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা কর্তব্য মনে করে নিজের বরাদ্দকৃত বাড়িটি পুলিশকে দিয়ে দিয়েছেন। কেবল নিজের বাড়ি দেওয়া নয়, এ দশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে সব সময়, প্রতিটি দুর্যোগে। শেখ রেহানার মহানুভবতার তুলনা নেই। মানবদরদি ও মহৎ বলেই নতুন প্রজন্মের আদর্শ তিনি।

লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস; অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।