• শুক্রবার   ২২ অক্টোবর ২০২১ ||

  • কার্তিক ৬ ১৪২৮

  • || ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সর্বশেষ:
পূর্বাচলে বঙ্গবন্ধু এক্সিবিশন সেন্টার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী একই দিনে উদ্‌যাপিত হলো তিন ধর্মের উৎসব চীন থেকে এলো আরো ৫৫ লাখ সি‌নোফা‌র্মের টিকা শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশে সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী যেই হোক ব্যবস্থা নেয়া হবে’

মহামারীর মধ্যেও বিনিয়োগ বাড়ছে

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২১  

করোনা মহামারীর মধ্যেও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে বিনিয়োগ যে গতিতে বাড়ছে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে গত অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির হিসাব দেখে। পরিসংখ্যান বলছে, গত অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ৫ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারের এলসি খুলেছেন উদ্যোক্তারা। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় বেড়েছে ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ফলে বিনিয়োগ বাড়ার ‘দৃশ্যমান’ অগ্রগতি ফুটে উঠেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে বিনিয়োগ নিবন্ধন পরিস্থিতিতেও গতি সঞ্চার হয়েছে। চলতি বছরের তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) দেশী-বিদেশী ১৮৪টি শিল্প ইউনিট স্থাপনের জন্য অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড (বিডা)। গতবছরের একই সময়ে বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধিত হয়েছিল মাত্র ৪৬টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ১৪ হাজার ১২৮ কোটি টাকা, যা ২০২০ সালের একই সময়ের তুলনায় ৮ হাজার ৪৪৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা বেশি। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ৩৮ হাজার ৯৬৯ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই অবস্থায় বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে আগামী নবেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলন। ঢাকার রেডিসন ওয়াটার গার্ডেনে ২৮ ও ২৯ নবেম্বর দুই দিনব্যাপী এ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন উদ্বোধন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, গত ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরে (২০২০ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন) বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান উপাদান মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানির জন্য ৫৭০ কোটি ২৬ লাখ (৫.৭০ বিলিয়ন) ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। এই অঙ্ক আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। অথচ অর্থবছরের ১০ মাস পর্যন্ত (জুলাই-এপ্রিল) মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ কম ছিল। গত মে মাসেই সে চিত্র পাল্টে গিয়ে ১৬ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। অর্থবছর শেষ হয় ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য ৬ হাজার ৭০৩ কোটি ৭৪ লাখ (৬৭.০৩ বিলিয়ন) ডলারের এলসি খোলা হয়েছে, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই পণ্য আমদানির জন্য এক অর্থবছরে এত বেশি বিদেশী মুদ্রার এলসি খোলা হয়নি। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ৫ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারের যে এলসি খোলা হয়েছে, সেটাও রেকর্ড। ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির জন্য আগের কোন বছরেরই এত ডলারের এলসি খোলেননি ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক হচ্ছে ক্যাপিটাল মেশিনারি। গত দেড় বছর ধরে দেশে করোনা মহামারী চলছে। এই মহামারীতে সবাই জীবন বাঁচাতেই বেশি ব্যস্ত ছিল। নতুন বিনিয়োগ-ব্যবসা বাণিজ্য-উৎপাদন নিয়ে খুব একটা ভাবেননি শিল্পোদ্যোক্তারা। কেননা, শুধু বাংলাদেশ নয়; গোটা বিশ্বই মহামারীর কবলে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। এখন অবশ্য, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে। সে সব দেশের মানুষ আগের মতো পণ্য কেনা শুরু করেছে। সে সব পণ্যের চাহিদার বিষয়টি মাথায় রেখেই বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা নতুন করে বিনিয়োগের ছক আঁকছেন। আর সে কারণেই ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছেন।’

বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করে উদ্যোক্তারা সাধারণত নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন বা কারখানার সম্প্রসারণ করে থাকেন। অর্থাৎ শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ে। বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতিশীলতা আসে।’ তিনি বলেন, ‘সার্বিক আমদানি বৃদ্ধির সঙ্গে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়া সত্যিই ভাল দিক। এটা যদি অব্যাহত থাকে, মহামারীর ধকল দ্রুত কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে।’

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ‘সরকার এক লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছিল, তার বেশিরভাগ বড় উদ্যোক্তারা পেয়েছে। যারা করোনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেই ছোট-মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তারা কিন্তু বঞ্চিত হয়েছে। এখন নতুন করে তাদের সহায়তা দিতে হবে।’ ‘মনে রাখতে হবে, ছোট-মাঝারি শিল্পগুলো ঘুরে না দাঁড়ালে বড় বড় শিল্পগুলোও ধাক্কা সামলে উঠতে পারবে না। তাই এখন ছোটরা যাতে ধাক্কা সামলে উঠে দাঁড়াতে পারে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই বিনিয়োগ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে চীন ও ভিয়েতনামের তৈরি পোশাকের অর্ডার এখন বাংলাদেশে আসছে। সে সুযোগগুলো ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে আমাদের রফতানি আয় আরও বাড়বে। এই দুই দেশ থেকে অন্য কোন পণ্যের বাজার বাংলাদেশে নিয়ে আসা যায় কিনা, সেটাও বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ পরিকল্পনা সাজাতে হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহ ৫৯২ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। যা ২০২০ সালে ৫৮২ দশমিক ১৭ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২০২১ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে এক দশমিক ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার কারণে ২০২০ সালে বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ দশ দশমিক ৮০ শতাংশ কমে দুই দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য গত তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) ১৮৪টি দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ১৪ হাজার ১২৮ কোটি টাকা, যা ২০২০ সালের একই সময়ের তুলনায় ৮ হাজার ৪৪৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা বেশি। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ৩৮ হাজার ৯৬৯ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছর একই সময়ে কোভিডের ধাক্কার মধ্যে মাত্র ৪৬টি শিল্প প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন করেছিল। অর্থের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৬৮৩ কোটি ৫০ লাখ। গত বছরের তুলনায় এ বছর দ্বিতীয় প্রান্তিকে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ১৩৮টি। বিডার তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য তিন মাসে সম্পূর্ণ স্থানীয় বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধিত হয়েছে ১৫৮টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ ১৩ হাজার ২৩৪ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বেশি। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে জুনে স্থানীয় বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধিত হয়েছিল ৩৮টি শিল্প ইউনিট। তখন প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। সে অনুযায়ী গত এপ্রিল-জুন সময়ে স্থানীয় শিল্পের নিবন্ধনের সংখ্যা বেড়েছে ১২০টি বা ৭৬৩ শতাংশ। এর মধ্যে রাসায়নিক শিল্পে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে বলে জানিয়েছে বিডা। এছাড়া পর্যায়ক্রমে রয়েছে ফুড এ্যান্ড এলায়েড খাত, সেবা ও বস্ত্র খাতে। একই সময়ে ১২টি শতভাগ বিদেশী বিনিয়োগের প্রস্তাব নিবন্ধন করা হয়েছে। আর দেশী-বিদেশী যৌথ বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধিত হয়েছে ১৪টি প্রতিষ্ঠান। মোট ২৬টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ৮৯৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২০ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৮টি বিদেশী প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধন করেছিল। সেগুলোর মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ৪ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। বিদেশী বিনিয়োগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে চামড়া খাতে। এরপর রয়েছে প্রকৌশল, সেবা ও রাসায়নিক খাত।

নভেম্বরে ঢাকায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলন ॥ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে আগামী নবেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঢাকার রেডিসন ওয়াটার গার্ডেনে ২৮ ও ২৯ নবেম্বর দুই দিনব্যাপী এ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মোঃ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বিনিয়োগ প্রসারের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের জন্য কাজ করছিলাম। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে এটি আটকে যায়। তবে এই সম্মেলন আগামী নবেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে ২৮ নবেম্বর সম্মেলন উদ্বোধন করতে সম্মতি দিয়েছেন। ইতোমধ্যে ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন এবং কিছু ইউরোপীয় দেশসহ ১০টি দেশের বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি এবং ব্যক্তিকে এ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হবে। যেখানে বাংলাদেশ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য যে সুবিধাগুলো দেবে তা উপস্থাপন করা হবে।’

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, চামড়া, ফার্মাসিউটিক্যালস, সক্রিয় ফার্মাসিউটিক্যালস উপাদান (এপিআই), লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, অটোমোবাইল শিল্প এবং প্লাস্টিকসহ ১৪টি প্রতিশ্রুতিশীল খাতের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা উপস্থাপনের জন্য ১৪টি প্রযুক্তিগত অধিবেশন হবে। বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ বিনিয়োগকারীদের দেয়া সুবিধাগুলো উপস্থাপন করে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য একটি পৃথক অধিবেশন করবে। এছাড়াও এখানে যৌথ বিনিয়োগ উৎসাহিত করার জন্য বিজনেস টু বিজনেস (বি টু বি) অধিবেশনও অনুষ্ঠিত হবে।