• রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||

  • আশ্বিন ৪ ১৪২৮

  • || ১০ সফর ১৪৪৩

সর্বশেষ:
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রত্যেক নাগরিকের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়েছে-সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ৩য় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রক্তদান কর্মসূচি শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে আসছে সৌদি আরব প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন হাকিমপুরের মৃৎশিল্পীরা দেশের ৬৮টি কারাগারের ৮৫ হাজার কারাবন্দিকে টিকা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু

নির্ভরতার প্রতীক ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২১  

সন্তান সম্ভাবা স্ত্রীর প্রসব পরবর্তী খরচের কথা চিন্তা করে এক মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা জমান ট্রাক চালক মো. আমীর হামজা। সব খরচ মিলিয়ে তবে মাত্র হাজার দু’য়েক টাকায় সব কিছু মিটে যাওয়ায় বেজায় খুশি এখন তিনি।

ট্রাক মালিক ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. সাইফু ইসলামের পরামর্শে স্ত্রীকে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে ভর্তি করিয়েছিলেন আমীর হামজা। মো. সাইফুল ইসলামের সঙ্গে আলাপকালে তিনি আমীর হামজার পাশাপাশি স্বাস্থ্য কেন্দ্র নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। জালানেন, নিজের প্রথম সন্তান স্বাস্থ্য কেন্দ্র্রে সাধারণ ডেলিভারিতে জন্ম নেয়। অথচ দ্বিতীয় সন্তান জন্মের সময় সামান্য সমস্যা নিয়ে ক্লিনিকে যেতেই সিজারিয়ান অপারেশন করাতে হয়।

এভাবেই প্রসূতি মায়েদের নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। সদর উপজেলার ১১টি কেন্দ্রে গত বছরও মাতৃ ও শিশু মৃত্যর হার ছিলো শূণ্য। গত কয়েক বছর ধরেই এটা অব্যাহত আছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন সেবা কেন্দ্রের দায়িত্বরতরা। কাজ করতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন নয় জন। এর মধ্যে একজন মারাও গেছেন। 

সূত্রটি জানায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫৬০ জন, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ৭৫৪ জন, ২০২০-২১ অর্থ বছরে ১২৬১ জন প্রসূতি মা ১১টি কেন্দ্রে সন্তান প্রসব করেছেন। এ চিত্র থেকে বুঝা যায় যে, এখানে দিনকে দিন সেবা গ্রহিতা প্রসূতি মায়ের সংখ্যা বাড়ছে। উল্লেখিত তিন বছরে কোনো মা কিংবা শিশু প্রসবজনিত কারণে মারা যায়নি। 

একাধিক কেন্দ্র ঘুরে গিয়ে প্রসূতি মায়েদের শতভাগ সেবা দানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত দিক অন্য হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকের চেয়ে অনেক উন্নতমানের। এখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হয় না।

এক বছরের মতো সময় ধরে এখানে সেবার মান পাল্টাতে শুরু করে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, ইউএনও, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সমন্বিত প্রয়াসে প্রসূতি মায়েদের সেবার ধরণ পাল্টানো শুরু হয়। মূলত ইউএনও ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এটা সম্ভব হয়েছে।

তবে কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসক না থাকায় অন্যান্য বিভিন্ন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকার সাধারন মানুষ। কেন্দ্রের প্রতি আস্থাও কিছুটা কম। সেবা নিশ্চিত করতে অতি দ্রুত এসব কেন্দ্রে চিকিৎসক নিয়োগের দাবি তুলেছেন এলাকাবাসী।

জেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরত্বে তালশহর (পূর্ব) ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই এর অবস্থান। বাইরে ছিমছাম পরিবেশ। ভেতরে ঢুকতেই মন জুড়ানোর পালা, প্রসূতি মায়েদের ডেলিভারি কক্ষটি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত (এসি)! প্রসূতিদের কাউন্সিলিং করার জন্য কক্ষটি সোফাসহ আনুষাঙ্গিক আসবাবপত্রে বেশ পরিপাটি।

দায়িত্বরত পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা মোহছেনা আক্তার বলেন, ‘জুলাইয়ে তালশহর ইউনিয়নে প্রসূতি মায়ের সংখ্যা ছিলো ২৮ জন। এর মধ্যে এ কেন্দ্রে ১৪ জনের নরমাল ডেলিভারি হয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করি সকল গর্ভবতী মাকে আমাদের এখানকার সেবা দেয়ার জন্য। কিন্তু অনেকে শহরমুখী হয়ে ক্লিনিকগুলোর প্রতি আস্থা দেখান।’

তালশহর (পূর্ব) ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. এনামুল হক বলেন, ‘এখনকার মায়েদের কিংবা তাঁদের পরিবারের মাঝে সিজার করার প্রবণতা খুব বেশি। বিশেষ করে প্রবাসী পরিবার হলে তো কোনো কথাই নেই। আমরা চেষ্টা করি সরকারি এ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যেন সেবা সেটা বুঝানোর। কেন্দ্রটির উন্নয়নে ইউএনও'র পরামর্শে যথাসাধ্য বরাদ্দ দিয়েছি।’

সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট বিভাগের ২০২১ সালের হিসেব অনুযায়ি চার লাখ ৯২ হাজার ৮১৩ জন অধ্যুষিত সদর উপজেলায় নারীর সংখ্যা দুই লাখ ৩৯ হাজার ৪০৭ জন। জুলাই ২০২১ নাগাদ সক্ষম দম্পতির সংখ্যা ৮০ হাজার ৪১৬ জন। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহন করেছেন ৫৯ হাজার ১১৯ জন। উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের সব কয়টিতে প্রসূতি মায়েদের সেবা দেয়ার সব ধরণের সুবিধা রয়েছে। সাম্প্রতিককালে এসব কেন্দ্রে সেবার মান বাড়ানো হয়েছে।

নাটাই (উত্তর) ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সুনামগঞ্জের সাকিনা বেগম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার থলিয়ারার সাকিনা বেগম নামে দুই প্রসূতি নারী চিকিৎসা নিচ্ছেন। সুনামগঞ্জের সকিনার মা মর্জিনা বেগম জানান, স্থানীয় এ কেন্দ্রটিতে সব ধরণের সুবিধা থাকায় গর্ভবতী মেয়েকে শশুর বাড়ি থেকে এখানে নিয়ে এসেছেন। এখানকার সুযোগ সুবিধা ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি খুবই ভালো দিক।

কেন্দ্রটি ঘুরে দেখা যায়, সব কিছুই যেন ঝকঝকে তকতকে। এখানে ডপলার মেশিন, পালস অক্সিমিটার, অক্সিটক্সি ইনজেকশন, স্ট্রিপ, প্রেশার মাপার যন্ত্র, হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার যন্ত্র, ওজন মাপার যন্ত্র, নেবুলাইজার, বেবি ম্যানেজম্যান্ট টেবিল, অক্সিজেন সিলিন্ডার, থেকে শুরু করে মায়েদের প্রসব পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সব ধরণের সুবিধা রয়েছে। এখানে রক্তদাতাদেরও একটি তালিকাও সংরক্ষণ করা হয় যেন প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা করা যায়। আছে মায়েদের জন্য একটি ব্যাঙ্ক, যেটি গর্ভধারণের পর দরিদ্র মায়েদেরকে দেয়া হয় অনাগত সন্তানের জন্য সঞ্চয় করতে।  আছে সৌর বিদ্যুৎ ও আইপিএস এর ব্যবস্থা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২০-২০২১ সালে এখানে ২৫১ জন মা সন্তান জন্ম দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিমাসে গড়ে ২০ জনের বেশি মা এখানে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। এর আগের অর্থ বছর ১৭৮ জন, ২০১৮-১৯ সালে ৯৭ জন প্রসূতি মা এখানে সন্তান জন্ম দেয়। এ চিত্র থেকেই বুঝা যায় যে, প্রতি বছরই সেবা গ্রহিতা মায়ের সংখ্যা এখানে বেড়েই চলছে। 

পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক ফরিদা আক্তার খানম জানান, ‘আমার জন্য স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবনের উপর তলায় থাকার ব্যবস্থা আছে। যে কারণে দিন কি রাত সে চিন্তা করতে হয় না। তিনিও মনে করেন এখানে যদি একজন চিকিৎসক দেয়া হয় তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে। প্রসূতি মায়ের সেবার পাশাপাশি অন্যান্য সেবাও দেয়া যাবে।’

কথা হলে রুবি আক্তার নামে এক স্বেচ্ছাসেবি জানান, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা গর্ভবতী মায়েদের তথ্য নিয়ে আসেন। সবাইকে বুঝানোর চেষ্টা করেন যে এখানে সব ধরণের সেবা আছে। দিনকে দিন এখানে সেবা গ্রহিতা মায়ের সংখ্যা বাড়ছে। 

নাটাই (উত্তর) ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. হাবিবুল্লাহ বাহার বলেন, ‘প্রসূতি মায়েদের সেবার জন্য এমন সুবিধা শহরেও নেই তারপরও অনেকে শহরমুখি হয়ে সিজার করতে বাধ্য হন। আমরা চেষ্টা করি এ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলে স্বাস্থ্য কেন্দ্রমুখি করার জন্য।’

সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আকিব উদ্দিন বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে যোগদানের পর আমি চেষ্টা করি কেন্দ্রগুলোতে প্রসূতি মায়ের সেবা বাড়ানোর জন্য। ইউএনও মহোদয়ের সার্বিক দিক নির্দেশনায় ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের সহযোগিতায় সেবার মান বাড়াতে সক্ষম হয়েছি। যে কারণে প্রতিনিয়তই এখানে সেবা গ্রহীতা প্রসূতি মায়ের সংখ্যা বাড়ছে। করোনার মহামারির এই সংকট কেটে গেলে স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসক দেয়ার বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হবে।’

সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, ‘সমন্বিত স্বাস্থ্য কেন্দ্র হিসেবে এসব কেন্দ্রগুলোকে গড়ে তুলতে সেবার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়। সহযোগিতার জন্য যখন যেখানে বলেছি সাড়া পেয়েছি। এতে করে এখানে আগের চেয়ে সেবার মান অনেক বেড়েছে। কেন্দ্রগুলো সারাদেশে মডেল হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশা করি।’