• রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||

  • আশ্বিন ৪ ১৪২৮

  • || ১০ সফর ১৪৪৩

সর্বশেষ:
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রত্যেক নাগরিকের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়েছে-সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ৩য় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রক্তদান কর্মসূচি শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে আসছে সৌদি আরব প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন হাকিমপুরের মৃৎশিল্পীরা দেশের ৬৮টি কারাগারের ৮৫ হাজার কারাবন্দিকে টিকা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু

উন্নয়নের ছোয়ায় ৬ বছরে বদলে গেছে বিলুপ্ত ছিটমহলের চিত্র

– নীলফামারি বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই ২০২১  

আজ ৩১ জুলাই। ছিটমহল বিনিময়ের সেই মুক্তিগাথার ৬ বছর অতিবাহিত হচ্ছে। ছিটমহলবাসীর ৬৮ বছরের চরম দুঃখ-কষ্ট, বন্দিদশা আর নিগ্রহের সেই দিন আর নেই। এই মানুষগুলোর নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে। 

আনন্দনগর, নতুন বাংলা, নগর জিগাবাড়ি ও নয়া বাংলা নীলফামারীর এই সাবেক চারটি ছিটমহল ঘুরলে চেনা যাবে না সেই বিলুপ্ত ছিটমহলের আগের বৈচিত্রতা। অতিত এই ছিটমহল গুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। দেখতে দেখতে বদলে গেছে অবহেলিত সেই মানুষজগুলো। রাস্তা, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষিসহ সব ক্ষেত্রে লেগেছে উন্নয়নের ছোয়া। পরিবর্তন ঘটে বঞ্চিত এসব মানুষের নাগরিক জীবন ব্যবস্থায়। 

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বড় খারিজা আনন্দনগর সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দা ময়মনা বেওয়া। ১৯০২ সালে জন্ম নেয়া এই নারী ১১৯ বছর ধরে আজও বেঁচে আছেন। তিনি জানালেন, আগে তিনি ছিটমহলের বাসিন্দা ছিলেন। তবে এখন আর ছিটমহলের বাসিন্দা নন তিনি। তিনি বলেন, আমি সেই আমি নই। আমি এখন বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক। ময়মনা জানান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়ে তার দুঃখ দুর্দশা দূর হয়েছে। ৬৮ বছরের বন্দী জীবন অবসানের ৬টি বছর অতিবাহিত হলো। তিনি সরকারের অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। তাই শেষ বয়সে এই বৃদ্ধা যেন নতুন করে মনোবল ফিরে পেয়েছেন। 

তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বামী বাবর আলী দেওয়ান মারা যান। ১৪ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল। ৭ ছেলে ও ৭ মেয়ের জননী তিনি। এর মধ্যে ২ ছেলে ও ৪ মেয়ে মারা গেছে। বেঁচে আছে ৫ ছেলে ৩ মেয়ে। নাতি-নাতনি ৪৫ জন। পুতি ৬ জন। দুই পুতির বিয়ে হয়েছে। সেই দুই পুতির ঘরে দুই সন্তানও এসেছে।

বৃদ্ধার বড় ছেলে লাল মামুদ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মায়ের নির্দেশে অংশ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার খেতাব পেয়েছি। লাল মামুদ জানালেন, সবার মাথার ছায়া হয়ে বেঁচে আছেন মা ময়মনা বেওয়া। যার নির্দেশে এখনও চলে পুরো পরিবার। বৃদ্ধা ময়মনা এখনও স্বামীর ভিটায় বাস করেন। মেজ ছেলের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম (৫৫), দুই নাতি জিন্নু ও আবুল হোসেনসহ ৯ সদস্যের পরিবারে তার বাস। স্বামীর কবর বিলুপ্ত ছিটমহলের ভেতরে থাকায় স্বামীর ভিটা ছাড়েননি তিনি। বৃদ্ধা বলেন আমাকে নীলফামারী ডিসি সাহেব অনেক সম্মান করেন। আমাকে নীলফামারী নিয়ে গিয়ে সম্মান দিয়ে হাতে তুলে দেয়া দিয়েছিলেন ক্রেষ্ট, মেডেল ও ১০ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড।

বিলুপ্ত ছিটমহল নগর জিগাবাড়ির নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের সাত নম্বর ওয়ার্ডে সংযুক্ত। এই ছিটমহলটি বাসিন্দা মৃত. তছির উদ্দিনের ছেলে গোলজার হোসেন(৬০)। পেশায় দিনমজুর। ছয় বছর আগের সময়ের মত এখন আর অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর কষ্ট বয়ে বেরাতে হয়না তাকে। স্বাভাবিক ভাবে নির্মল পরিবেশে স্বাধীন জীবন যাপন করতে পারছেন তিনি। নেই ভয় কিংবা শংকা। পরিচয় গোপন করে কোন কিছু করতে হয় না তাকে। গোলজার হোসেন জানান, আগে আমার পরিচয় ছিলো না। না বাংলাদেশী না ভারতীয়। পরিচয় গোপন করে চলতে হতো। বাংলাদেশী নাগরিক হওয়ার আগে কোন আইনি সহয়তা পেতাম না। আমাদের কোন সুযোগ সুবিধা ছিলো না। এখন সেই দিন আর নেই। বদলেছে সবকিছু। আর এটি করে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। ধন্যবাদ জানাই তাকে। 

একই এলাকার শাহজাহান আলী বলেন, বাংলাদেশ হওয়ার আগে এই এলাকার জমি জমা বিক্রি হতো কাগজে সই স্বাক্ষর করে। এর চেয়ে অন্য কিছু আর ছিলো না। ৫হাজার টাকায় শতক বিক্রি হয়েছে এখানকার জমি কিন্তু বাংলাদেশ হওয়ার পর একই জমি ৩৫-৪০ হাজার টাকা শতকে বিক্রি হচ্ছে। রেজিস্ট্রি হচ্ছে। এরচেয়ে আনন্দের কি হতে পারে। 

এলাকার উপর দিয়ে বয়ে গেছে কুমলাই নদী। ব্রীজ অভাবে নদী পাড়াপাড় হয়ে আসা যাওয়া করতে হতো অন্য তিন ছিটমহলের মানুষদের। এখন সেই নদীর উপর একটি ব্রীজ হওয়ায় কষ্ট চলে গেছে মানুষদের। সেখানকার ফরিদুল ইসলামের ছেলে রাসেল ইসলাম বলেন, আমাদের তো আগে আজওয়ার পাড়ার লোক হিসেবে বলতো। মানে পরিচয়হীন হিসেবে ছিলাম ছয়বছর আগে। এখন আর কেউ আজওয়ার পাড়ার মানুষ বলে না। কুমলাই নদীটির নগর জিগাবাড়ি পয়েন্ট ব্যবহার করে চলাচল করতো তিন ছিটমহলের অনেক বাসিন্দা। ব্রীজ না থাকায় অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে আমাদের। এখন আর সেই দুর্ভোগ নেই। তিনি বলেন, বিলুপ্ত ছিটমহলটি ভারতের জায়গায় ছিলো কিন্তু আমরা ভারতের নাগরিক হইনি। ভারতে যাইনি আমরা। আমাদের কাছে বাংলাদেশ প্রিয় মনে হয়েছে। এখানেই আমাদের ঠিকানা করে নিয়েছি। সরেজমিনে বিলুপ্ত ছিটমহল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে উন্নয়নের ছোয়া লেগেছে এসব এলাকায়। বদলেছে জীবন যাত্রার মান। চলাচলের অযোগ্য কাঁচা রাস্তা হয়েছে পাকা, আলো জ্বলছে বাড়িতে বাড়িতে, বিশুদ্ধ পানির জন্য বসেছে নলকুপ, হয়েছে স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানা, উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্র এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্পন্নের জন্য হয়েছে কমিউনিটি সেন্টার। ভিজিডি কার্ড, ভিজিএফ, সরকারী নানা প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সহযোগীতা পাচ্ছে এই এলাকার মানুষরা। 

মনজিলা খাতুন নামের এক গৃহিনী বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ যাচ্ছি সেখানে জন্মনিবন্ধন কার্ড করতে পারছি। জাতীয় পরিচয় পত্র পেয়েছি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ইউনিয়ন পরিষদ ভোট দিতে পেরেছি, আগে এগুলোর কিছুই ছিলো না। তিনি বলেন, তখন  তো কোন আইন কানুন ছিলো না। পরিচয় গোপন করে বড়  মেয়ের বিয়ে দিতে হয়েছে। এখন আর শংকা নেই, ভয়  নেই। বৈধ নাগরিক হিসেবে সব সুবিধা নিতে পারছি। তবে সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো আমাদের ছেলে মেয়েদের দিকে যেন খেয়াল রাখা হয় কারণ আমরা তো শেষ। সন্তানরাই আগামী দিনের কান্ডারি। অগ্রাধিকার দিয়ে চাকুরীর ব্যবস্থা যেন করে দেয়া হয়। 
 
সূত্র মতে, ২০১৫ সালের ৩১জুলাই রাত থেকে দীর্ঘজীবনের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকদের সাথে একীভুত হন ডিমলা উপজেলার চারটি ছিটমহলের ১১৮৩ জন বাসিন্দা। যার আয়তন ১৬৮ দশমিক ৪৮ একর। 

জটুয়া খাতা দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী মীম আকতার বলেন, এখন আমরা বাংলাদেশের মানুষ। নির্ভয়ে স্কুলে যেতে পারছি, পড়াশোনা করতে পারছি। এলাকায় আমার মত অনেকে পড়াশোনা করতে পারছে। পরিচয় নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করছে। আমরা পড়াশোনা শেষ করে ভালো কিছু করতে চাই। আরেক ছাত্রী সুমাইয়া আকতার বলেন, এই এলাকার মানুষরা অত্যন্ত গরীব। সংসারের খরচ মেটানো কষ্টকর এরউপর আমাদের মত মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অবিভাবকদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এ জন্য সরকারের বিশেষ কোন পদক্ষেপ আমরা চাই যেতে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে নিজের খরচও বহন করতে পারি আমরা নিজেরা। বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন(৭০) বলেন, আমি ১৬ শতাংশ জমি দিয়েছি সরকারকে। যাতে ভালো কিছু হয় এখানে। কিন্তু হয়েছে কমিউনিটি সেন্টার। এখানে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রয়োজন। এলাকার মানুষদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য বিশেষ কাজে আসবে। তিনি বলেন, প্রতি বছর আমরা ৩১ জুলাই রাতে আনন্দ উৎসব করি কিন্তু এবার হচ্ছে না। করোনার কারণে সবকিছু বন্ধ। গতবারও একই কারণে করতে পারিনি। 

নীলফামারীর জেলা প্রশাসক হাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ২০২০ সালের ৮ মার্চ আন্তজার্তিক নারী দিবসে নীলফামারী শিল্পকলা একাডেমির সম্মেলন কক্ষে নীলফামারী জেলা প্রশাসনের পরিবারের আয়োজনে অপরাজিতা নারী হিসাবে সাবেক ছিটমহলবাসী ময়মন বেগমকে  সম্মাননা প্রদান করেছিলাম।  জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই বৃদ্ধা ১১৯ বছর বয়সে আজ বিলুপ্ত ছিটমহলের এক জীবন্ত ইতিহাস বৈ কি! তিনি জানান নীলফামারীর যে চারটি সাবেক ছিটমহল রয়েছে তার সার্বিক উন্নয়নে বদলে গেছে। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায় বলেন, সরকারী সকল নির্দেশনা অনুসরণ করে সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের। উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখন ছিটমহল হিসেবে নয় প্রয়োজন অনুসারে এলাকাগুলোর কাজ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এলজিইডি থেকে বিলুপ্ত ছিটমহলের উন্নয়নে জন্য বিশেষ একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং সড়ক সম্প্রসারণ ও মেরামত করা হবে। করোনার কারণে কাজটি শুরু হয়নি তবে শুরু হবে দ্রæত। খগাখড়িবাড়ি, গয়াবাড়ি ও টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নে যুক্ত হয়েছে এই চার বিলুপ্ত ছিটমহল। 

উল্লেখ যে, ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তিটি বাস্তবায়ন করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।এ ইতিহাস সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব আর মানবতার ইতিহাস। ৬৮ বছর ধরে যাঁদের রাষ্ট্র ছিল না, ছিল না পরিচয়, সবাই যাঁদের চিনতো ছিটবাসী হিসেবে, আজ তাঁরা তাঁদের জাতীয়তার পরিচয় পেয়েছে। পেয়েছে নাগরিকত্বের পরিচয়, গর্বে বুক ফুলিয়ে। 

 ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কার্যকর হয় ছিটমহল বিনিময়। অথচ এই সকল মানুষজন গুলোকে ব্রিটিশ শাসনকর্তা সিরিল র‌্যাডক্লিফের ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তিজনিত যে সীমানা নির্ধারণ-প্রক্রিয়া সাধিত করেছিল, সৃষ্টি করা হয়েছিল দুটি নতুন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান। তারই নানা বিরূপ ও অমানবিক ফলাফলের একটি ছিল এই ছিটমহল। ১৬২টি বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপের মতো এসব ছিটমহলবাসী পাক্কা ৬৮ বছর ধরে চরম মানবিক অধিকারহীনতার শিকার হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে সমগ্র ভারতবর্ষের মানুষ যখন ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন দেশের নাগরিক পরিচয় লাভ করেছিল, তখন রাতারাতি ছিটমহলের বাসিন্দারা নাগরিকত্বহীন হয়ে পড়েছিল। সিরিল র‌্যাডক্লিফের সীমানা নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় তারা হয়ে পড়েছিল “নিজভ‚মে পরবাসী”।আজ সেই ছিটমহল হারিয়ে গেছে। জন্ম নিয়েছে তাদের পরিচয়ের নাগরিকত্ব।